বুধবার । ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ । ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২

রোজায় সেহরি ও ইফতারের গুরুত্ব

এম এ হুসাইন

রমজানের প্রথম দশকের শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। এ মাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেহরি এবং ইফতার খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়। নবিজির ঘোষণায় সেহরি ও ইফতার কল্যাণ ও সওয়াবের কাজ। তাই সেহরি ও ইফতারের গুরুত্ব জেনে নেওয়া জরুরি।

সেহরি ও ইফতার রোজার বরকত, কল্যাণ এবং সওয়াবের অনুষঙ্গ। দোয়া কবুলের অন্যতম সময়। বরকতে ভরপুর সুন্নতের অনুসরণ ও অনুকরণ। তাই আল্লাহর ফরজ বিধান রোজা পালনের শুরুতে ভোর রাতে সেহরির খাওয়া যেমন কল্যাণের, আবার সারাদিন রোজা পালন শেষে সন্ধ্যায় যথাসময়ে ইফতারও সওয়াব ও বরকতের কাজ।

রোজা পালন মহান আল্লাহর নির্দেশ। যা শেষ রাতে সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। আর সন্ধ্যায় ইফতারের মাধ্যমে শেষ হয়। এই রোজার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম বা রোজা ফরজ করা হয়েছে; যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া (আত্মশুদ্ধি) অর্জনে করতে পার (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)।”

রমজানের রোজা পালনের জন্য শেষ রাতে খাবার খাওয়াই হলো সেহরি। রাতের শেষভাগে সেহরি খাওয়া আবশ্যক। এটি নবিজি (সাঃ)’র নির্দেশ ও সুন্নত। অনেকেই রাতের নামাজ তারাবি পড়ে গভীর রাতে কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ে। সকালে ওঠে ফজর নামাজ আদায় করে। এমনটি করলে সেহরির বরকত অর্জিত হবে না। সেহরির বরকত সম্পর্কে হাদিসের একাধিক বর্ণনা এসেছে, হজরত আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবিজি (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা শেষ রাতে খাবার (সেহরি) খাও। তাতে বরকত রয়েছে (বুখারি ও মুসলিম)।”

হজরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও ফেরেশতারা সেহরি গ্রহণকারীর জন্য প্রার্থনা করেন (তাবারানি ও ইবনে হিব্বান)।”

অন্য হাদিসে এক সাহাবি বর্ণনা করেন, আমি নবিজি (সাঃ)’র কাছে গিয়ে দেখি, তিনি শেষ রাতে খাবার খাচ্ছেন। এরপর তিনি বললেন, এটা বরকতময়। আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য তা দান করেছেন। তোমরা তা (সেহরি) ত্যাগ করো না (নাসাঈ)।

অনেকে এমন আছেন, যারা সেহরি না খেয়েই রোজা রাখেন, যা মোটেও ঠিক নয়। কেননা হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, সেহরির মাঝে বরকত নিহিত। আবার কেউ কেউ সেহরির সময় হওয়ার আগেই সেহরি খেয়ে ফজর নামাজ আদায় না করেই ঘুমিয়ে যান। হাদিসে এসেছে,

১. রসুলুল্লাহ (সাঃ)’র সেহরি খাওয়া আর ফজরের নামাজের আজানের মাঝে সময়ের ব্যবধান ছিল- পঞ্চাশ আয়াত কোরআন তেলাওয়াত করার সমান সময় (বুখারি)।

২. রসুলুল্লাহ (সাঃ) হজরত বেলাল (রাঃ)’র আজান শুনে সেহরি খাওয়া থেকে বিরত হতে নিষেধ করেছেন। কারণ হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু রাত থাকতেই আজান দিয়ে দিতেন। তাই সেহরির যে সময় নির্ধারণ করা আছে সেই সময়ই সেহরি খাওয়া উচিত (মুসলিম)।

আধুনিক যুগের ইসলামিক স্কলারদের মতে, কোরআনুল কারিমের পঞ্চাশ আয়াত তারতিল সঙ্গে তথা যথানিয়মে ধীরস্থিরভাবে তেলাওয়াত করতে বিশ মিনিট সময় প্রয়োজন হয়। তাই আজানের ২০ মিনিট আগে সেহরি খাওয়া শেষ করা সুন্নত। নবিজি (সাঃ) সেহরি খাওয়াতে কিছুটা বিলম্ব করতে পছন্দ করতেন। তিনি উম্মতে মুহাম্মাদি কেও এ নির্দেশই দিয়েছেন; তারাও যেন এমনটি করেন।

সেহরিতে অধিক খাবার খেলে বান্দা রোজার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। কেননা অতিরিক্ত খাবার শরীরে আলস্য তৈরি করে। ফলে মানুষ যেমন ইবাদত মুখী হতে পারে না আবার জৈবিক চাহিদা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে রোজার শিক্ষা অনাহারী ও ক্ষুধায় ক্লেষ্ট মানুষের কষ্ট অনুভব করা যায় না।

পক্ষান্তরে নাম মাত্র খাবার বা পানি গ্রহণ সেহরি করলে শারীরিক শক্তি একেবারেই নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে ইবাদত-বন্দেগি করাই দুষ্কর হয়ে পড়ে।

ঘরে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার থাকার পরও অনেকে সামান্য খাবার ও পানি দিয়ে নামমাত্র সেহরি করে থাকেন। এমনটি ঠিক নয়। কেননা সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে রোজা শুরু করা সুন্নত। সেহরিতে রয়েছে কল্যাণ। তাই খুব বেশি এবং একেবারে কম না খেয়ে পরিমিত পরিমাণ তথা সুন্নত পদ্ধতিতে সেহরি খাওয়া উত্তম।

সেহরি খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়া সুন্নতের পরিপন্থি কাজ। শারীরিকভাবেও তা ক্ষতিকর। সেহরি খেয়ে জামাতে নামাজের প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হওয়া উত্তম। রসুলুল্লাহ (সাঃ) রমজান মাসে ফজরের নামাজ আদায় করে মসজিদে ইবাদত করতেন, সাহাবিদের দ্বিনের শিক্ষা দিতেন। সূর্যোদয়ের পর ইশরাকের নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরতেন।

রমজানের রোজা রাখা যেমন ফরজ, তেমনি রোজার জন্য নিয়ত করাও ফরজ। নিয়ত ছাড়া দিনভর না খেয়ে উপোস থাকা এবং স্ত্রী সহবাস না করলেও রোজা হবে না। রোজা রাখার জন্য সেহরির পর অন্তরের দৃঢ় সংকল্প করাই নিয়ত।

ইফতারের সুন্নতি পদ্ধতি :
যথাসময়ে ইফতার করাও সুন্নত। ইফতারের ক্ষেত্রেও রয়েছে কিছু করণীয় এবং দিকনির্দেশনা। যা পালন করা সুন্নত এবং উত্তম।

দ্রুত ইফতার করা : ইফতারের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা সুন্নত। এ সময় সাংসারিক কাজ বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা সুন্নত পরিপন্থি কাজ। হাদিসে এসেছে- ‘রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “(দেরি না করে) দ্রুত ইফতারকারী কল্যাণ লাভ করতে থাকে (বুখারি ও মুসলিম)।”

দোয়া কবুলের মুহূর্তগুলোর মধ্যে ইফতারের সময়ও একটি। অনেকেই গল্প-গুজবের মধ্য দিয়ে ইফতার করে থাকেন। তাই ইফতারের সময় গল্প না করে দোয়া করার মাধ্যমে সুন্নতের আমল করা জরুরি। আবার ঘরের নারীরা এ সময় বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। তাদের উচিত, এ সময় ইফতার ও দোয়া করা। হাদিসে এসেছে, রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। পিতামাতার দোয়া, রোজাদারের (ইফতারের সময়ের) দোয়া ও মুসাফিরের দোয়া (মুসনাদে আহমদ)।”

অপচয় সুন্নত পরিপন্থি কাজ। চাই তা ইফতার হোক কিংবা অন্য খাবার। আর সংযমের মাসে ইফতারের আয়োজন নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং জৌলুস করাও ঠিক নয়। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমরা খাও ও পান করো। অপচয় কোরো না (সুরা আরাফ : আয়াত : ৩১)।”

ইফতারের আগ মুহূর্তে বেশি বেশি ইসতেগফার পড়া- উচ্চারণ : ‘আসতাগফিরুল্লাহাল আজিম, আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লাহু আল-হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম, ওয়া আতুবু ইলাইহি লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।’

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন- উচ্চারণ : জাহাবাজ জামাউ; ওয়াবতালাতিল উ’রুকু; ওয়া ছাবাতাল আঝরূ ইনশাআল্লাহ।”

অর্থ : ‘(ইফতারের মাধ্যমে) পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপসিরা সিক্ত হলো এবং যদি আল্লাহ চান সাওয়াবও স্থির হলো (আবু দাউদ, মিশকাত)।”

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত সেহরি ও ইফতারে সুন্নত বিষয়গুলো মেনে চলা। হাদিসের ওপর আমল করা। সেহরি ইফতারের কুসংস্কার ও মন্দ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকা। সেহরির পর নিয়ত করা, ইফতারের আগে তওবা-ইসতেগফার করা, ইফতারের সময় দোয়া পড়া এবং ইফতারের পর শুকরিয়া আদায় করে দোয়া পড়া।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সেহরি ও ইফতারের গুরুত্ব উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। সেহরি ও ইফতারে সুন্নতের ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন