ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় নিয়তের সাথে পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকার নাম সাওম বা রোজা। ইসলামি বর্ষপঞ্জির নবম মাস রমজান। এটি এমন একটি মাস যার সাথে বিশ্ব মুসলিমের রয়েছে আত্মার সম্পর্ক। রোজা শুধু আল্লাহর জন্য। আল্লাহতায়ালা নিজের সঙ্গে রোজার সম্পর্ক ঘোষণা করেছেন। এমনকি তিনি সব ইবাদত-বন্দেগি থেকে রোজাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছেন।
হাদিসে কুদসিতে রাসুল (সাঃ) বলেন, “আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য। কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম, তা শুধু আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব (মুসলিম ঃ ২৭৬০)।”
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “বান্দা আমার সন্তুষ্টির আশাতেই খাদ্য, পানীয় ও সম্ভোগ বর্জন করে থাকে।”
রমজানের রোজা আল্লাহপাকের নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ এনে দেয়। গুনাহের কারণে আল্লাহপাক ও তার বান্দার মাঝে অন্তরায়ের সৃষ্টি হয়। ফলে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে তার বান্দার সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়ে এবং পরিণামে বান্দা তার রবের করুণা থেকে বঞ্চিত হয়। মাহে রমজান আল্লাহপাকের রহমত ও করুণা সৃষ্টির এক অবারিত দ্বার। মালিকের সাথে বান্দার সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে অন্তরায় সৃষ্টি হয়, যে শিথিলতা দেখা দেয়, রমজানের রোজা তা দূর করে।
রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “যখন রমজান উপস্থিত হয় তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে যায় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিশপ্ত শয়তানগুলো শিকলবদ্ধ করে রাখা হয়। তাই শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। ফেরেশতাদের মারফত বলে দেওয়া হয় যে, হে নেককার লোকজন! তোমরা সওয়াবের কাজসমূহ সম্পন্ন করো এবং বদকারদেরকে বলে দেওয়া হয় তোমরা পাপ কাজ হতে বিরত থাকো।”
রোজা অশ্লীল কার্যাবলী ও কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। রোজার দিনে রোজাদারকে তার হাত-পা, নাক-কান, জিহ্বা এমনকি অন্তরকেও নিয়ন্ত্রণে রাখার শিক্ষা দেয়। রোজা হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ, যাতে করে মানুষ সারা বছর এভাবে চলতে পারে। যেমন শেষ রাতে সেহরি খাওয়া, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে পানাহার বন্ধ করা, সূর্যাস্তের পর পরই নির্দিষ্ট সময়ে ইফতার করা যাতে আগে কিংবা পরে না হয়। আবার ইফতারের পর মাগরিবের নামাজ ও পানাহারের পর রুটিন মাফিক এশা ও তারাবির নামাজের জন্য প্রস্তুত হওয়া একটা প্রশিক্ষণ। এই এক মাস যে ব্যক্তি রোজার মাধ্যমে তাকওয়ার অনুশীলন গ্রহণ করে বছরের বাকী এগার মাস তার প্রতিফলন হয়।
রোজার সঙ্গে তারাবির নামাজের সম্পর্ক অত্যন্ত সুনিবিড়। আরবি ‘তারাবি’ শব্দের অর্থ প্রশান্তি লাভ করা, বিশ্রাম নেওয়া। তারাবি নামাজ পড়াকালে প্রতি চার রাকাত পরপর বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে তাসবিহ ও দোয়া পাঠ করা হয়। তাই এই নামাজকে তারাবির নামাজ বা সালাতুত তারাবি বলা হয়। ইসলামি পরিভাষায় রমজান মাসে এশার নামাজের পরে আদায়কৃত সুন্নত নামাজকে তারাবির নামাজ বলে। (কামুসুল ফিকহ) ইবাদত হিসেবে তারাবির নামাজের গুরুত্ব অনেক। কেননা রাসুল (সাঃ) তারাবির নামাজ আদায়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। আবার তিনি এই ইবাদত নিয়মিতভাবে আদায় করলে উম্মতের ওপর তা ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করেছেন। তাই তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। নারী-পুরুষ সবার জন্যই এ হুকুম প্রযোজ্য। তারাবির নামাজ দশ সালামে ২০ রাকাত। এটি খোলাফায়ে রাশেদীন এবং অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে প্রমাণিত।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ফারুক (রাঃ)-এর নির্দেশে সাহাবিদের শ্রেষ্ঠ কারি হজরত উবাই ইবনে কা’বের ইমামতিতে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ জামাতের সঙ্গে প্রচলন হয়। যা মক্কা শরিফ ও মদিনা শরিফসহ সারা বিশ্বে আজ অবধি চলমান।
তারাবি নামাজ পাপমোচনের অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সাঃ) রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়তে উৎসাহিত করে বলতেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে আল্লাহর একান্ত সন্তুষ্টির জন্য রমজান মাসে তারাবির নামাজ আদায় করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হবে (সহিহ মুসলিম: ১৬৬৫)।”
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন। আর আমি তোমাদের জন্য তারাবির নামাজকে সুন্নত করেছি। সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজান মাসে দিনের বেলায় রোজা পালন করবে এবং রাতে তারাবির নামাজ আদায় করবে, সে ব্যক্তি গুনাহ থেকে এরূপ পবিত্র হয়ে যাবে, যেরূপ নবজাতক শিশু মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয় (নাসায়ি: ১/২৩৯)।
যথাযথভাবে রোজা পালন না করলে রোজার বরকত হাসিল হবে না। রোজা অবস্থায় কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ করা যাবে না। কেউ গালি দিলে বা ঝগড়া করলে তার প্রতি উত্তরে আমি রোজাদার বলে তার সাথে ঝগড়া ফ্যাসাদ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। রোজা গরিবের অভুক্তের যন্ত্রণা উপলব্ধি করার একটি মাধ্যম; যাতে করে ধনবান ব্যক্তিরা বুঝতে পারে যে না খেয়ে থাকা কত কষ্টকর এবং যাতে তারা গরিবদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারে। রমজানের সিয়ামে মানুষের মনের রিপুগুলোকে সংযত করে, দ্বীন দরিদ্র ক্ষুধার্তদের কষ্ট ও যন্ত্রণা, ব্যথা ও বেদনা হৃদয়ঙ্গম করতে সাহায্য করে, মানুষকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়, তাকে ‘রমিয’ করে তোলে। রোজা থাকা অবস্থায় অনেক হালাল বস্তুর ব্যবহার ও সেসব সযত্নে পরিহার করতে হয়। এর দ্বারা যেমন আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয়াদি থেকে বিরত থাকার অভ্যাস গড়ে উঠে, তেমনি ব্যক্তির জীবনে ত্যাগের মনোভাবও সৃষ্টি হয়ে যায়।
রোজা তথা সিয়াম সাধনার নৈতিক, আধ্যাত্মিক এবং ধর্মীয় উপকারের পাশাপাশি পার্থিব কল্যাণও উপেক্ষা করার মতো নয়। সেদিকে লক্ষ্য করলে রোজা শুধু ইবাদতই নয়, মানব কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও বটে। রমজানের শিক্ষাকে যদি আমরা প্রকৃত অর্থে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি এবং সকল কর্মকাণ্ডে অনুসরণ করি, তাহলে তা হবে আমাদের জীবনে মাহে রমজানের সাধনার যথার্থ প্রতিফলন। আমাদের প্রত্যাশা সিয়াম সাধনার কল্যাণে আমরা শুদ্ধ হবো, নির্মল হবো এবং আল্লাহর রহমত লাভে সমর্থ হবো। আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে রমজানের চিরন্তন চেতনার যথার্থ প্রতিফলন হবে- এটাই আজ একান্ত কামনা।
লেখক : সম্পাদক মাসিক সারস, পূর্ব রূপসা, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম

