ইসলামের আগে মধ্যপ্রাচ্যে রোজা কেমন ছিল

গেজেট প্রতিবেদন

রমজান মাসে এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানরা ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন। ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি হলো রোজা। তবে উপবাস বা খাদ্য থেকে বিরত থাকার ধারণা ইসলামের আবির্ভাবের অনেক আগেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতা ও ধর্মে প্রচলিত ছিল। ইতিহাসের নানা স্তর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উপবাস ছিল আত্মশুদ্ধি, পাপমোচন, দেবতার সন্তুষ্টি ও আধ্যাত্মিক সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় উপবাস ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন, দেবতাদের সন্তুষ্ট করতে এবং আত্মাকে পাপ ও ত্রুটি থেকে শুদ্ধ করতে বিভিন্ন আচার পালন করা জরুরি। বসন্ত উৎসব, ফসল উৎসব ও নীলনদের প্লাবন উপলক্ষে তারা নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করতেন, যার মধ্যে উপবাসও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে তাদের উপবাসের ধরন নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, উপবাস কেবল পুরোহিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আবার অনেকে বলেন, সাধারণ মানুষও এতে অংশ নিতেন। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালনের রীতি ছিল। এই উপবাসের মেয়াদ তিন দিন থেকে শুরু করে ৭০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারত। উপবাসের সময় খাদ্য, পানীয় ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে বিরত থাকার বিধান ছিল।

এমনও উল্লেখ পাওয়া যায় যে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে ৭০ দিন ধরে শুধু শাকসবজি ও পানি গ্রহণের অনুমতি ছিল। মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনায়ও উপবাস পালনের প্রচলন ছিল। যদিও অনেক গবেষক মনে করেন, প্রাচীন মিশরীয় উপবাস ও পরবর্তী আসমানি ধর্মগুলোর রোজার মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।

জরথুস্ত্রবাদ ও ইয়াজিদি ধর্মে উপবাস
খ্রিস্টপূর্ব বহু শতাব্দী আগে পারস্য অঞ্চলে প্রচলিত ছিল জরথুস্ত্রবাদ। এই ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন জরথুস্ত্র। তার শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই ধর্ম দীর্ঘ সময় পারস্য অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তবে জরথুস্ত্রবাদে উপবাসকে উৎসাহিত করা হতো না। তাদের বিশ্বাস ছিল, দীর্ঘ সময় খাদ্য থেকে বিরত থাকলে মানুষের শারীরিক শক্তি হ্রাস পায় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই অন্যান্য অনেক ধর্মের মতো এখানে কঠোর উপবাসের বিধান দেখা যায় না।

অন্যদিকে কুর্দি জনগোষ্ঠীর একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় ইয়াজিদি ধর্ম- এ উপবাসের প্রচলন রয়েছে। ইয়াজিদিদের মধ্যে তিন দিনের রোজা রাখার রীতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই রোজা মঙ্গলবার শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার শেষ হয়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকা হয়।

ইয়াজিদিদের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের রোজা এবং ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের জন্য আরেক ধরনের রোজা প্রচলিত। শিশু, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে অব্যাহতি রয়েছে। ধর্মীয় নেতারা কখনও টানা তিন দিন রোজা পালন করে বিশেষ উৎসবের মাধ্যমে তা সমাপ্ত করেন। এছাড়া ‘সাওম খুদান’ নামে আরেক ধরনের রোজা আছে, যা সাধু ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনকারীরা পালন করেন। দীর্ঘ সময় উপবাস পালনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক মর্যাদা অর্জনের ধারণাও তাদের মধ্যে বিদ্যমান।

ইহুদিধর্ম
মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন আসমানি ধর্মগুলোর মধ্যে ইহুদিধর্ম অন্যতম। এ ধর্মে উপবাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, বিশেষত ‘ইয়োম কিপুর’ বা প্রায়শ্চিত্ত দিবসে। এই দিনটিকে ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইয়োম কিপুর প্রায় ২৬ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। সূর্যাস্ত থেকে পরদিন রাত পর্যন্ত ইহুদিরা খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকেন। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই নবী মুসা দ্বিতীয়বার সিনাই পর্বত থেকে তাওরাতের ফলক নিয়ে অবতরণ করেন। তাই দিনটি পাপমোচন, আত্মসমালোচনা ও সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভের জন্য উৎসর্গ করা হয়।

ইহুদিধর্মে অসুস্থ ও গর্ভবতী নারীদের উপবাস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সাধারণত শনিবার ও কিছু ধর্মীয় উৎসবের দিনে উপবাস পালন করা হয় না, তবে ইয়োম কিপুর এর ব্যতিক্রম। এছাড়া ব্যক্তিগত প্রায়শ্চিত্ত বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছা উপবাসের প্রচলনও রয়েছে।

খ্রিষ্টধর্মে উপবাস
খ্রিষ্টধর্ম-এ উপবাস আধ্যাত্মিক অনুশীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উপবাসের মাধ্যমে বিশ্বাসীরা ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করেন। বাইবেলের দানিয়েল গ্রন্থে উপবাস, প্রার্থনা ও অনুশোচনার উল্লেখ রয়েছে।

খ্রিষ্টধর্মে উপবাসের নির্দিষ্ট সময় সব সম্প্রদায়ের জন্য এক নয়। বিভিন্ন গির্জা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করে। ইস্টারের আগে ৪০ দিনের উপবাস বিশেষভাবে পরিচিত। এ সময় অনেকে দিনে অন্তত ১২ ঘণ্টা খাদ্য থেকে বিরত থাকেন, আবার কেউ কেউ আরও দীর্ঘ সময় উপবাস পালন করেন।

খ্রিষ্টানদের কাছে উপবাস কেবল খাদ্য বর্জন নয়; এটি আত্মসংযম, প্রার্থনা ও দানশীলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। যিশুখ্রিষ্টের ত্যাগ ও শিক্ষাকে স্মরণ করাও এই উপবাসের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, উপবাস কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়; এটি মানবসভ্যতার দীর্ঘ আধ্যাত্মিক অনুশীলনের অংশ। দেবতার সন্তুষ্টি, আত্মশুদ্ধি, পাপমোচন কিংবা আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনের লক্ষ্যেই বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন সমাজে উপবাসের চর্চা গড়ে উঠেছে।

ইসলামে রমজানের রোজা নির্দিষ্ট বিধান ও সময়সীমার মধ্যে পালিত হলেও, তার আগে মধ্যপ্রাচ্যের বহু সভ্যতা ও ধর্মে উপবাসের নানা রূপ বিদ্যমান ছিল। ফলে বলা যায়, রোজা মানব ইতিহাসে একটি বহুমাত্রিক ও প্রাচীন ঐতিহ্য, যা বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে নতুন রূপে বিকশিত হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন