মঙ্গলবার । ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১১ই ফাল্গুন, ১৪৩২

শবে বরাতে করণীয় ও বর্জনীয়

মাওঃ মোঃ ফজলুর রহমান

আজ রাতে পালিত হবে পবিত্র শবে বরাত। শবে বরাত শব্দটি ফারসি। শব অর্থ হলো রাত বা রজনী; আর বরাত মানে ভাগ্য। একত্রে শবে বরাতের অর্থ হচ্ছে ভাগ্যের রজনী। আবার আরবিতে বলা হয় লাইলাতুল বারাআত। লাইলাতুন অর্থ হলো রাত আর বারাআতুন অর্থ হলো মুক্তি। একত্রে অর্থ হলো মুক্তির রাত। বর্তমান সময়ে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির কবলে পড়েছে শবে বরাত। কেউ বলেন, শবে বরাত বলতে ইসলামে কিছুই নেই। আবার অনেকে মসজিদে সমবেতভাবে ইবাদত-বন্দেগিতে রাত অতিবাহিত করে থাকে। আবার অনেকে এ রাতে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান উদ্যাপন করেন।

পবিত্র শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত হচ্ছে ‘শবে বরাত’। শবে বরাতকে হাদিসের পরিভাষায় লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বলা হয়। এই রাতে আল্লাহ তায়ালা সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর আসমানে নেমে আসেন। বান্দাকে ডাকতে থাকেন। বান্দার যাবতীয় প্রয়োজন আল্লাহর কাছে পেশ করার আহ্বান করেন। এই রাতের মাহাত্ম্য সম্পর্কে রয়েছে বেশ কিছু সহিহ হাদিস। তা ছাড়া এ রাতের মাহাত্ম্য সম্পর্কে রয়েছে বিশিষ্ট ইমামগণের নির্ভরযোগ্য বহু বক্তব্য। হজরত আবু বকর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। সে রাতে তিনি মুশরিক এবং অন্য ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষক ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন (মুসনাদে বাজজার- ৮০)।”

অন্যত্র মুয়াজ বিন জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “শা’বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে মহান আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান। সে রাতে তিনি মুশরিক এবং উম্মতে বিভেদ সৃষ্টিকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন (সহিহ ইবনে হিব্বান- ৫৬৬৫; শুআবুল ইমান, বায়হাকি- ৩৮৩৩)।”

অন্যত্র ইবনে উমর (রাঃ) বলেন, “পাঁচটি রাত এমন রয়েছে, যে রাতের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ১. জুমু‘আর রাত। ২. রজব মাসের প্রথম রাত। ৩. শা‘বান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত (শবে বরাত)। ৪. ইদুল ফিতরের রাত। ৫. ইদুল আজহার রাত (মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক- ৭৯২৭)।”

হজরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, “এক রাতে রসুলুল্লাহ (সাঃ)কে আমি হারিয়ে ফেললাম। আমি তাঁর খোঁজে বের হলাম। জান্নাতুল বাকিতে (সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ কবরস্থান) তাঁকে পেলাম। তিনি বললেন, ‘তুমি কি ভয় করছো যে, মহান আল্লাহ তাঁর রসুলের ওপর অত্যাচার করেছেন?’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি ধারণা করেছি যে, আপনি অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে এসেছেন।’ রসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের বকরি-লোমের সংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেন (তিরমিজি- ৭৩৯; ইবনে মাজাহ- ১৩৮৯)।”

আমাদের অনেকেই শবে বরাতে দলবেঁধে কবর জিয়ারত করেন। কিন্তু কোথাও এর ফজিলত সংক্রান্ত বর্ণনা নেই। এমনিতে যেকোনো সময় এবং শবে বরাতে শরিয়তসিদ্ধ পন্থায় কবর জিয়ারত করতে পারি।

রসুলুল্লাহ (সাঃ) কাউকে না বলে, একাকী, সংগোপনে জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন। কাউকে যাওয়ার কথা বলেননি এবং তিনি নিজেও কাউকে নিয়ে যাননি। পুরো বিষয়টি হাদিস থেকে সহজেই অনুমেয় হয়। আমাদের জন্য কর্তব্য হলো, শরিয়তসিদ্ধ পন্থায় জীবনযাপন করা।

তাছাড়া শা’বানের এক তারিখ থেকে সাতাশ তারিখ পর্যন্ত রোজা রাখার বিশেষ ফজিলতের কথা হাদিস শরিফে আছে। আইয়ামে বীজ তথা প্রতি মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে রোজা রাখার ব্যাপারে হাদিস শরিফে উৎসাহিত করা হয়েছে। সেই সাথে যয়ীফ সনদে বর্ণিত একটি হাদিসে বিশেষভাবে পনেরো তারিখের রোজা রাখার নির্দেশনাও পাওয়া যায়। হাদিস শরিফে এসেছে, – পনেরো শা’বানের রাত (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে, তখন তোমরা তা ইবাদত-বন্দেগিতে কাটাও এবং পরদিন রোজা রাখ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৮৪)।”

আগেই বলা হয়েছে যে, যেহেতু বিভিন্ন সহিহ হাদিসে শা’বান মাসের রোজার সাধারণ ফযীলত এবং আইয়ামে বীজের রোজার ফযীলত উল্লিখিত হয়েছে, পাশাপাশি যয়ীফ সনদে উপর্যুক্ত হাদিসটিও বিদ্যমান রয়েছে, তাই কেউ যদি এই সকল বিষয় বিবেচনায় রেখে পনেরো শা’বানের রোজা রাখেন তাহলে তিনি সওয়াব পাবেন, ইনশাআল্লাহ। আর বর্তমান সমাজে শবে বরাত ও শবে কদর উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদ ও দোকানপাটে আলোকসজ্জা করা হয়, পটকা ফুটানো হয় ও আতশবাজি জ¦ালানো হয়। সেই সাথে হালুয়া-রুটি, খিচুড়ি ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করা হয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে এগুলো ভুল রেওয়াজ, যা পরিহার করা আবশ্যক। আলোকসজ্জা বা আতশবাজিতে অপচয়ের পাশাপাশি বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণও রয়েছে। তাই এগুলো পরিত্যাজ্য।

আর হালুয়া-রুটি বা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য বানানো, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিতরণ করা, খিচুড়ি রান্না করা এবং গরীব-মিসকীনদের মাঝে বণ্টন করা সাধারণ অবস্থায় জায়েজ ও ভালো কাজ হলেও এটাকে এ রাতের বিশেষ আমল মনে করা এবং এসবের পিছনে পড়ে এ রাতের মূল কাজ তওবা-ইস্তেগফার, নফল ইবাদত ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হওয়া শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। মূল কথা এই রাতগুলো উৎসবের রাত নয়, ইবাদত-বন্দেগি ও তওবা- ইস্তেগফারের রাত। তাই রসম-রেওয়াজের অনুগামী হয়ে এ রাতে উপযুক্ত কাজকর্মে লিপ্ত হওয়া নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত- করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ রাতে বিশেষ করে আমরা কয়েকটি আমল করতে পারি।

১. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা ২. জিকির-আজকার করা ৩. দীর্ঘসময় নিয়ে নফল নামাজ পড়া, ৪. সালাতুত তাসবীহ পড়া, ৫. বেশি বেশি ইস্তেগফার করা, ৬. অধিক পরিমাণে চোখের পানি ঝরিয়ে নিজের জন্য, সমস্ত মুসলমানের জন্য এবং মৃত আত্মীয়-স্বজনের জন্য দোয়া করা। ৭. লায়লাতুল বরাতের পরের দিন রোজা রাখা ৮. একাকী কবর জিয়ারত করা। হজরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, নবীজী (সাঃ) এ রাতে মদিনার কবরস্থান ‘জান্নাতুল বাকি’তে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করতেন।

আল্লাহ তায়ালা সকলকে সহিহ বুঝ দান করুন, সঠিকভাবে আমল করার তাওফীক দিন, আমিন।

লেখক : প্রধান শিক্ষক, পশ্চিম বানিয়াখামার দারুল কুরআন বহুমুখী মাদ্রাসা, খতীব, বায়তুল আমান জামে মসজিদ, খুলনা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন