পবিত্র মাহে রমজানের আগমনি বার্তা নিয়ে বিশ্ব মুসলিমের মাঝে হাজির হলো পবিত্র শাবান মাস। সর্বশ্রেষ্ঠ মাস রমজানের আগাম প্রস্তুতির তাগিদ ও শবেবরাতের উপহার নিয়ে এলো বরকতময় শাবান মাস। শাবান আরবি শব্দ, যার অর্থ বিস্তৃত। অর্থাৎ এই মাসে আল্লাহ তায়ালার রহমত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ মাস রহমতের মাস, পৃথিবীবাসীর উপর আল্লাহ তায়ালা নিজ রহমত বিস্তার করে দেন। এ কারণে এ মাসের নাম রাখা হয়েছে শাবান মাস।
আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেছেন, “শাবানের নাম এজন্য শাবান করে রাখা হয়েছে যে, এতে রমজানের জন্য বেশি বেশি পুণ্য প্রকাশ পায়। আর রমাজানকে এজন্য রমাজান করে নামকরণ করা হয়েছে, এটা গুনাহকে জ্বালিয়ে দেয়।”
শাবান মাসের ফজিলত অন্যতম। এই মাসের ফজিলত আল্লাহর রাসুল (সঃ) এর দুটি হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বলেন, “রসুলুল্লাহ (সঃ) এরশাদ করেছেন, রজবের ফজিলত সমস্ত মাসের উপর এমন, যেমন কুরআনের ফজিলত সমস্ত কালাম এর উপর। আর শাবানের ফজিলত সমস্ত মাসের উপর এমন, যেমন আমার ফজিলত সমস্ত নবীদের উপর। আর রমজানের ফজিলত সমস্ত মাসের উপর এমনা, যেমন আল্লাহর ফজিলত সমস্ত মাখলুকের উপর।”
হজরত উসমান (রাঃ) বলেন, “রসুলুল্লাহ (সঃ) ইরশাদ করেছেন, শাবান আমার মাস আর রমাজান আল্লাহর মাস। (শোয়াবুল ইমান-৩৮১৩) এটা নিয়ম, বড়ো বড়ো বাদশার নিজস্ব জিনিসের সম্মান অন্যরকম। এভাবে এখানেও, আল্লাহর রাসুল (সঃ) অনেক বড়ো এবং সম্মানিত মানুষ, তাই যখন আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেছেন, শাবান আমার মাস, তাহলে বুঝা গেলো শাবান মাসের ফজিলত কেমন। এভাবে রমজানের ফজিলত অন্যতম, এজন্যই আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেছেন রমাজান আল্লাহর মাস। তাই এত ফজিলত পূর্ণ শাবান মাসে একজন মোমেনের জন্য করণীয় কী? আল্লাহর রাসুল (সঃ) সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এমাসে কী করতেন, কীভাবে কাটাতেন। তা আমাদের জন্য জানার বিষয়। তো আমরা হাদিসে ও সালাফীদের দেখতে পাই, এ-মাসের আমল তারা কী করতেন। নিচে তা আলোচনা করা হলো।
১. বেশি বেশি রোজা রাখা। হজরত উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)! শাবান মাসে আপনাকে যত রোজা রাখতে দেখি, অন্য মাসে এত পরিমাণ রোজা রাখতে দেখিনি। অর্থাৎ আপনি কেন এ মাসে এত বেশি রোজা রাখেন? (সাঃ) বললেন, এটি এমন একটি মাস। যা রজব এবং রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দুইটি মাসের মধ্যে পড়ে। আর অধিকাংশ মানুষ এ মাসটি সম্পর্কে গাফেল থাকে। অর্থাৎ এ মাসটি সম্পর্কে তারা বেখবর থাকে, উদাসীন থাকে। যার ফলে তারা ভালো আমল করে না। তারা ভাবে যে, রমজান তো আছেই (নাসাঈ)।
২. বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন এবং প্রসিদ্ধ ইমামগণ শাবান মাস আসলেই বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করতেন। কুরআন নাজিলের মাসের বরকত লাভে এ মাসে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করায়ও রয়েছে ফজিলত ও মর্যাদা।
৩. রসুলুল্লাহ (সাঃ) রজব ও শাবান মাসব্যাপী এ দোয়া বেশি বেশি পড়তেন, দোয়াটি হলো- ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজব ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগ না রমাদান’। অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! রজব মাস ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন; রমজান আমাদের নসিব করুন (মুসনাদে আহমাদ, প্রথম খণ্ড : ২৫৯, শুআবুল ইমান, বায়হাকি,৩ : ৩৭৫)’।
৪. বেশি বেশি সদকা (দান-সহযোগিতা) করা। হজরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন যে, সাহাবায়ে কেরাম রা. শাবান মাসের চাঁদ দেখলে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াতে মশগুল হয়ে পড়তেন। যাদের উপর জাকাত ফরজ হয়েছে তারা মালের জাকাত আদায় করে দিতেন। যাতে গরিব মুসলমানদের রোজা রাখার ব্যবস্থা হয়ে যায়। বিচারকগণ কয়েদিদেরকে ডেকে, হয় শাস্তির ফয়সালা করে দিতেন, না হয় মুক্তি দিয়ে দিতেন।
৫. বেশি বেশি ইসতেগফার করা। রমজানে রহমত বরকত মাগফেরাত ও নাজাতের জন্য শাবান মাস থেকেই সালফে সালেহিনগণ বেশি বেশি ইসতেগফার করতেন। যা মানুষকে রমজানজুড়ে আমলে উদ্যোগী করে তোলে। আর এমাসের আরও ফজিলত পূর্ণ রাত রয়েছে শবেবরাত, যা সামনে আসছে। তাই এই বিশেষ ফজিলতের মাসে প্রত্যেক মোমেনের জন্য করণীয় হলো উপর্যুক্ত আমল গুলোকে ফলো করা। এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগা। আপনি রমজান পাচ্ছেন কিনা তা জানা নেই, তাই আপনি এই মাসকে, আজকের দিনকে আপনার জন্য সুযোগ মনে করে নিন, এবং প্রস্তুতি নিন। আগামীকাল আপনি পাবেন কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। আজ থেকেই আমল শুরু করে দিন। আর রমজানের প্রস্তুতি নিন। আল্লাহ তায়া’লা আমাদের সকলকে বুঝার ও আমল করার তৌফিক দান করুন, আমিন।
লেখক : প্রধান শিক্ষক, পশ্চিম বানিয়াখামার দারুল কুরআন বহুমুখী মাদ্রাসা, খতিব বায়তুল আমান জামে মসজিদ, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম

