রজব মাসের আগমনে আমাদের মনে পড়ে পবিত্র শবে মিরাজের কথা। মিরাজের রাতটি আমাদের দেশে পালিত হয় যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে। মানুষের হেদায়েতের জন্য প্রত্যেক নবীকেই আল্লাহপাক বিশেষ কিছু অলৌকিক মু’জেজা দান করেছেন, যা ওই সময়ের জন্য বিস্ময়কর। কিন্তু শ্রেষ্ঠ নবী ও শেষ নবী মুহাম্মদ (সঃ)-কে আল্লাহ তায়ালা এমন এক মু’জেজা দান করেছিলেন, যা শুধু অতীত নয়, বর্তমান বিজ্ঞানীদের জন্যও এক বিস্ময় ও চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বিজ্ঞান যেখানে প্রথম আকাশের খবরই জানে না, সেখানে হজরত মুহাম্মদ (সঃ) সপ্তম আকাশে ঘুরে এসেছেন আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে। পবিত্র কুরআন ও হাদিসের ভাষ্যমতে, হজরত মুহাম্মদ (সঃ) হিজরতের বছর খানেক আগে কোনো এক রাতে পবিত্র মক্কা নগরী থেকে প্রথমে ফিলিস্তিনের বায়তুল মোকাদ্দাস মসজিদ, তারপর সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে সপ্তম আসমান পর্যন্ত পরিভ্রমণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটা মিরাজ নামে পরিচিত। এটাকে বলা যায় রাতের বেলায় মহানবীর মহাকাশ ভ্রমণ। আল্লাহর অলৌকিক নিদর্শন ও কুদরত প্রত্যক্ষ করানো, ঊর্ধ্বলোক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান প্রদান, সৃষ্টিজগতের রহস্য উন্মোচন ও স্বচক্ষে বেহেশত-দোজখ দেখানো ছিল মিরাজের অন্যতম উদ্দেশ্য।
স্বপ্নে নয়, মহানবী (সাঃ)-এর ইসরা ও সিরাজ স্ব-শরীরে জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল। কুরআন ও হাদিসে তার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত-যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই (বনী ইসরাঈল:১)।”
মহাকাশ ভ্রমণকালে তিনি মহান আল্লাহর সঙ্গে কোনোরূপ দোভাষী ছাড়াই সরাসরি (পর্দার ব্যবধান থেকে) কথা বলেন। এছাড়াও তিনি সমস্ত ফেরেশতাদের সর্দার জীবরাঈল (আঃ) কে স্বচক্ষে দেখেন। এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা কুরআনে এভাবে দেওয়া হয়েছে : “তোমাদের সঙ্গী পথভ্রষ্ট হননি এবং বিপথগামীও হননি; এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। কুরআন ওহি, যা প্রত্যাদেশ হয়। তাঁকে শিক্ষা দান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা, সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল। ঊর্ধ্ব দিগন্তে, অতঃপর নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকর ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম। তখন আল্লাহ তাঁর দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করবার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রসুলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে? নিশ্চয় সে তাকে (জীবরাঈল আঃ কে) আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুলমুন্তাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার, তদ্দারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি এবং সীমালংঘনও করেনি। নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলি অবলোকন করেছে (সূরা নাজ্ম:১-১৮)।” সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, মহানবী (সঃ) মিরাজের রাতে সপ্তম আকাশ পরিভ্রমণ করেন এবং স্বচক্ষে জান্নাত ও দোজখ দেখেন এবং আরও বিস্ময়কর নিদর্শন অবলোকন করেন।
বর্তমানে বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার যুগে মানুষ কতটুকু মহাকাশ ভ্রমণ করেছে? শুধু ছোট্ট একটি চাঁদে মানুষ যেতে সক্ষম হয়েছে। বাকি রয়েছে, কোটি কোটি অগণিত নক্ষত্র মন্ডল। এক এক নক্ষত্র মণ্ডলে আবার আছে কোটি কোটি নক্ষত্র বা তাঁরা। অথচ, সমস্ত তাঁরা বা নক্ষত্র মন্ডল আছে প্রথম আকাশের নিচে। এ প্রসঙ্গে কুরআনে বলা হয়েছে, “তিনি সপ্তম আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন আমি সর্বনিম্ন আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুসজ্জিত করেছি (সূরা মুলক:৩-৫)।” মিরাজ বর্তমান ও অনাগত বিজ্ঞানীদের জন্য এক বিস্ময় ও চ্যালেঞ্জ।
(লেখক : অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে)।
খুলনা গেজেট/এনএম

