বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবেশীর অধিকার

মাওঃ মুহাঃ ফজলুর রহমান

সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে মানুষ পরস্পর একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। বাড়ির পাশাপাশি বসবাসকারী আত্মীয় বা অনাত্মীয় লোকজনই প্রতিবেশী। মানুষের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে এরাই সর্বাগ্রে এগিয়ে আসে এবং সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে। কাজেই এই প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করা জরুরি।

রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, জিবরাইল (আঃ) আমাকে প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে এত বেশি তাগিদ করেছেন যে, আমার কাছে মনে হয়েছে প্রতিবেশীকে মিরাছের অংশীদার বানিয়ে দেওয়া হবে (সহিহ বুখারি ৬০১৪; সহিহ মুসলিম ২৫২৪)। কিন্তু আজকাল এ বিষয়ে আমাদের মাঝে চরম অবহেলা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে শহরের মানুষের মাঝে। বছরের পর বছর পার হয় পাশের বাড়ির কারো সাথে কোনো কথা হয় না, খোঁজ খবর নেওয়া হয় না; বরং বিভিন্ন ভাবে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া হয়। অথচ প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ ও তাকে কষ্ট না দেওয়াকে ঈমানের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, যে আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৫) আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৩)। প্রতিবেশী বলতে মুসলিম, কাফের, নেক বান্দা, ফাসেক, বন্ধু, শত্রু, বিদেশি, স্বদেশি, উপকারী, ক্ষতিসাধনকারী, আত্মীয়, অনাত্মীয়, নিকটতম বা তুলনামূলক একটু দূরের প্রতিবেশী সবাই অন্তর্ভুক্ত। আর প্রতিবেশী সাধারণত তিন শ্রেণির হয়ে থাকে এবং তাদের হকও বিভিন্ন দিকে লক্ষ্য করে কম বেশী হয়ে থাকে।

১. যার এক দিক থেকে হক থাকে। সে হলো, অনাত্মীয় বিধর্মী প্রতিবেশী। এ ব্যক্তির হক শুধু প্রতিবেশী হওয়ার ভিত্তিতে।

২. যার দুই দিক থেকে হক থাকে। সে হল, মুসলিম প্রতিবেশী, যার সাথে আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী এবং মুসলিম হওয়ার দিক থেকে।

৩. যার তিন দিক থেকে হক থাকে। সে হল, মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী। এ ব্যক্তির হক প্রতিবেশী, মুসলিম ও আত্মীয় হওয়ার দিক থেকে। তবে প্রত্যেক শ্রেণিই যেহেতু প্রতিবেশী

তাই প্রতিবেশীর সকল হকের ক্ষেত্রে সবাই সমান হকদার। আর প্রতিবেশীর খোঁজ খবর রাখা, বিপদে আপদে এগিয়ে যাওয়া, একে অপরের সুখ-দুঃখের শরিক হওয়া, হাদিয়া আদান প্রদান করা, সেবা শুশ্রুষা করা, প্রতিবেশীর কেউ মারা গেলে সান্ত্বনা দেওয়া, কাফন দাফনে শরিক হওয়া, একে অপরের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিবেশীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হয় এমন সব ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি সবই একজন মুমিনের স্বভাবজাত বিষয় হওয়া উচিত।

আল্লাহ আল কুরআনুল কারিমে সূরা নিসার-এর ৩৬ নং আয়াতে আল্লাহর ইবাদাত ও তার সাথে কাউকে শরিক না করা-এই বিধানের সাথে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের হক। তার মধ্যে রয়েছে মাতা পিতার হক, আত্মীয় স্বজনের হক, এতিমের হক ইত্যাদি। এসব গুরুত্বপূর্ণ হকের সাথেই আল্লাহ প্রতিবেশীর হককে উল্লেখ করেছেন। এ থেকেই বোঝা যায়, প্রতিবেশীর হককে আল্লাহ কত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তা রক্ষা করা আমাদের জন্য কত জরুরি।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “(অর্থ) তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং কোনো কিছুকে তার সাথে শরিক করো না। এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, মুসাফির ও তোমাদের দাস-দাসীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।”

সহজ ভাষায়, যে প্রতিবেশীর সাথে ভালো আচরণ করে এবং প্রতিবেশীর সকল হক যথাযথভাবে আদায় করে, প্রতিবেশী তার উপর সন্তুষ্ট থাকে এবং আল্লাহও তার উপর সন্তুষ্ট থাকেন।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আম্র (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন…“যে স্বীয় প্রতিবেশীর দৃষ্টিতে ভালো সেই সর্বোত্তম প্রতিবেশী” (সহিহ ইবনে খুযাইমা হা. ২৫৩৯; শুআবুল ঈমান বায়হাকী, হা. ৯৫৪১; মুসনাদে আহমদ হা. ৬৫৬৬)।

হজরত ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “ঐব্যক্তি মুমিন নয় যে পেটপুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে” (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস ২৬৯৯; আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ১১২)।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, অনেক প্রতিবেশীই এমন আছে, যাদের দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তারা অভাবে দিন কাটাচ্ছে। আবার আমার কাছে কখনো চাইবেও না।

কুরআন মাজিদে এদেরকে ‘মাহরুম’ বলা হয়েছে, সূরা যারিয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, (অর্থ) এবং তাদের সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও মাহরূমের (বঞ্চিতের) হক। (সূরা যারিয়াত : ১৯) এক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য, নিজে থেকে তাদের খোঁজ খবর রাখা এবং দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন পন্থা অবলম্বন করা, যাতে সে লজ্জা না পায়। এজন্যইতো জাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে এটা বলে দেওয়া জরুরি নয় যে, আমি তোমাকে জাকাত দিচ্ছি, বরং ব্যক্তি জাকাতের যোগ্য কি না এটুকু জেনে নেয়াই যথেষ্ট। আর আমি যদি প্রতিবেশীর প্রয়োজন পূর্ণ করি তাহলে আল্লাহ আমার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবেন এবং আমার সহায় হবেন। হাদিস শরিফে এসেছে, যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করে আল্লাহ তার প্রয়োজন পূর্ণ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৪২, সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮০)।

লেখক : প্রধান শিক্ষক, পশ্চিম বানিয়াখামার দারুল কুরআন বহুমুখী মাদ্রাসা, খতিব বায়তুল আমান জামে মসজিদ।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন