পাকিস্তানের সঙ্গে করা পানি বণ্টন চুক্তি মেনে চলতে হবে ভারতকে। একই সঙ্গে কাশ্মীরে নির্মাণাধীন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজও সীমিত রাখতে হবে। সোমবার নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন (পিসিএ) এ নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, সিন্ধু পানি চুক্তি (ইনডাস ওয়াটার্স ট্রিটি) এখনো পুরোপুরি কার্যকর এবং এটি স্থগিত বা বাতিল করার কোনো বৈধ কারণ ভারতের ছিল না।
তবে আদালতের এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই আদালতের ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো এখতিয়ার নেই। আদালতের রায়ের কোনো প্রভাব ভারতের চলমান প্রকল্পগুলোর ওপর পড়বে না বলেও জানানো হয়েছে।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি সই হয়। দুই দেশের মধ্যে তিনটি যুদ্ধ ও একাধিক সংঘাতের পরও ছয় দশকের বেশি সময় ধরে চুক্তিটি কার্যকর ছিল। চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়।
কেন চুক্তি স্থগিত করেছিল ভারত
২০২৫ সালের এপ্রিলে কাশ্মীরের একটি পর্যটনকেন্দ্রে হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত চুক্তিটি স্থগিত করে। হামলার তিন হামলাকারীর দুজন পাকিস্তানি বলে দাবি করেছিল নয়াদিল্লি। তবে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে পাকিস্তান।
এরপর ভারত কাশ্মীর অঞ্চলের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধারে পানি ধারণের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করে। পাকিস্তান এর বিরোধিতা করে আইনি পদক্ষেপ নেয়। ইসলামাবাদের অভিযোগ ছিল, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত সিন্ধু পানি চুক্তির আওতাভুক্ত ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
চুক্তি বহাল থাকার কথা বললেন আদালত
পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন বলেছে, সিন্ধু পানি চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। চুক্তিটি স্থগিত বা বাতিল করার পক্ষে ভারতের দেওয়া কোনো কারণই গ্রহণযোগ্য নয় বলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত দিয়েছে আদালত।
আদালত আরও বলেছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোতে ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে হবে। সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব-এই পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি মূলত পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। অন্যদিকে রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু নদীর পানি ব্যবহারের অধিকার মূলত ভারতের।
পাকিস্তানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কাশ্মীরে নির্মাণাধীন রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা জারি করেছে আদালত। নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি বাঁধের দেয়াল ও পানি প্রবেশের কাঠামো নির্মাণ করতে পারবে না ভারত।
বিশ্বব্যাংক নিয়োগ করা একজন নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে ওই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো সিন্ধু পানি চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। তাঁর সিদ্ধান্তের ৯০ দিন পর পর্যন্ত রাতলে প্রকল্পের নির্দিষ্ট অংশে কাজের ওপর এই সীমাবদ্ধতা থাকবে।
রায় মানছে না ভারত
আদালতের সিদ্ধান্তের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, তথাকথিত এই সালিসি আদালতের ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো এখতিয়ার নেই। এখন বা ভবিষ্যতে আদালতের কোনো বক্তব্যই ভারতের চলমান প্রকল্পের ওপর প্রভাব ফেলবে না।
ভারত আদালতটির সদস্য হলেও দীর্ঘদিন ধরে এই সালিসি প্রক্রিয়ার এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে পাকিস্তান আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং চুক্তির অধীনে দুই দেশের মধ্যে আবার আলোচনার পথ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে দুই দেশের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালে পাকিস্তান এ বিষয়ে সালিসি প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। পরে বিশ্বব্যাংক ওই প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত রাখে। ২০২২ সালে তা আবার শুরু হয়।
নতুন এই রায়ের ফলে ভারত-পাকিস্তানের পানি বিরোধ আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে কাশ্মীরকে ঘিরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে সিন্ধু নদীর পানি ব্যবস্থাপনা এখন আবারও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

