২০১৪ সালে বিজেপি যখন নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ক্ষমতায় এলো তখন এক বছর যেতে না যেতেই কলকাতার খিদির ডকের নাম বদলেছিল। ঐ ডকের নাম ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বন্দর। বদলে দিয়ে হয়ে গেল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর। তখনই বোঝা গিয়েছিল, বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসবে নেতাজীর নামে পশ্চিমবঙ্গে যা থাকবে তা পাল্টে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামে করা হবে।
মাত্র দুমাস ক্ষমতায় আসতে না আসতেই বিজেপির রাজ্যসভাপতি শমীক ভট্টাচার্য নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ও তার প্রতিষ্ঠিত দলকে গুন্ডা বলেই বসলেন। আর বীরভূম জেলার রামপুরহাটের একটি বিখ্যাত রাস্তা রয়েছে নেতাজীর নামে, তাও বদলে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদের নামে করা হয়ে গেল। এখন যা মনে হচ্ছে তাতে, ভারতের কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ও রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার একত্রিত করে পশ্চিমবঙ্গে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নামে যা কিছু রয়েছে তার সবটাই পাল্টে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদের নামে করা হবে। এতে কোনোভাবেই অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কলকাতা দমদম নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা কলকাতার বিবাদী বাগ এলাকার নেতাজি সুভাষ রোডের নাম বদলে গিয়ে শ্যামাপ্রসাদের নামে হয়ে গেলে আমরা অবাক হব না।
এছাড়াও কলকাতার মেট্রো রেলের স্টেশনগুলোর যার নাম নেতাজীর নামে রয়েছে তাও যদি শ্যামাপ্রসাদের নামে হলে কারুর কিছুই করার থাকবে না। পশ্চিমবঙ্গকে কার্যত শ্যামাপ্রসাদময় হয়ে যাচ্ছে। কারণটা কী? মুর্শিদাবাদ-মালদহ-ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্তির পিছনেও নাকি শ্যামাপ্রসাদের নাকি বিরাট ভূমিকা ছিল? অবিভক্ত ভারতে অবিভক্ত বঙ্গপ্রদেশের জঠর থেকে পশ্চিমবঙ্গকে বের করে আনাও নাকি শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা ছিল। সেখানে শাসক মুসলিম লীগের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম দল কংগ্রেস। পণ্ডিত নেহেরু, কমিউনিস্ট পার্টি বা নির্দল সদস্যের সমবেত ঐক্যের কোনো দাম নেই। এক আসনবিশিষ্ট শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা সবকিছু করে দিয়েছে। পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু ও কংগ্রেস নেতৃত্বের কৌশলগত চাল সেদিন পাঞ্জাব থেকে পূর্ব পাঞ্জাবকে ও বঙ্গদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষ ভোটিং পদ্ধতিতে ছিনিয়ে এনেছিল।
এখন দেখা যেতে পারে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ছোটো করছে কেন বিজেপি?
সম্প্রতি সুভাষচন্দ্র-শ্যামাপ্রসাদ বিতর্কে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে এক বিশিষ্টজনের মন্তব্যকে খুব প্রণিধানযোগ্য মনে করি।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বিবিসিকে বলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে একটি আইকনিক ফিগার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সেটা যে সরাসরি নেতাজি (সুভাষচন্দ্র বসু)-র বিপক্ষেই হবে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
তার মতে, সুভাষচন্দ্র বসু এদের (বিজেপি) রাজনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু কারণ তিনি বার বার হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ দুইয়ের বিরুদ্ধেই বক্তৃতা করেছেন ও লিখেছেন। সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনীতি সরাসরি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বিপরীতমুখী।
সুভাষের বিরুদ্ধে শ্যামপ্রসাদকে একজন আইকন হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। কিন্তু জাতীয় স্তরে নেহেরুর বিরুদ্ধে ভাষ্য গঠন করতে তারা সুভাষ বসুকে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহার করেছে। এই কাজ কিছুটা করেছেন কয়েকজন সংঘ ঘনিষ্ঠ সুভাষচন্দ্র বসু বিষয়ক লেখক।
মি. ভট্টাচার্য মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে প্রতিষ্ঠা করতে শমীক ভট্টাচার্য আর রাখঢাক না করেই সরাসরি সংঘর্ষের জন্ম দিয়েছেন।
১৯৪০ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে সুভাষচন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লক দল ভালো সাফল্য পান। সেসময় তিনি মুসলিম লীগের আব্দুর রহমান সিদ্দিকীকে মেয়র করার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন। ঐ নির্বাচনে সব ছোট-বড়ো দলের সঙ্গে জোট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু মহাসভা সাড়া দেয়নি। তখনতো বঙ্গ প্রদেশে দুটি বড় দল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগকে তিনি কাছে নিলেন সুচতুর ব্রিটিশের ব্রিটিশকে জব্দ করতে। তাতে সফল। তাই এখন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য নেতাজি ও তার দল ফরোয়ার্ড ব্লককে গুন্ডা সাজালেন। কিন্তু নেতাজি আজাদ হিন্দ বাহিনী ও সরকার সমস্ত ধর্মীয় ভেদাভেদের উর্ধ্বে। এই বাহিনী ব্রিটিশদের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। এদের সশস্ত্র সংগ্রাম ব্রিটিশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
খুলনা গেজেট/এএজে

