ইরানের বিরুদ্ধে সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। নতুন কিছু স্যাটেলাইট চিত্র বা ভূ-উপগ্রহের ছবিতে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পরিপন্থি। ওই চুক্তিতে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি’র সঙ্গে যৌথভাবে এই নতুন স্যাটেলাইট চিত্রগুলো বিশ্লেষণ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ছবিগুলো নতুন এক প্রশ্ন সামনে এনেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ‘ভেঙে গেছে’ বলে ঘোষণা দেন। এর আগেই ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করেছিল কি না, তা নিয়ে এখন সংশয় তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ক্রমাগত হামলার জবাবে মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি ইরানে নতুন করে বিমান হামলা শুরু করার পরই এ তথ্য সামনে এলো।
স্যাটেলাইট চিত্রে কী দেখা গেছে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পারচিন নামক একটি এলাকায় পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য বিস্ফোরক তৈরি করা হতো বলে ধারণা করা হয়। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের আগে ইরান এই স্থাপনাটির চারপাশে একটি কংক্রিটের সুরক্ষা প্রাচীর তৈরি করেছিল। এতেই বোঝা যায় স্থাপনাটি তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমাবর্ষণে পারচিনের এই সাইটটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে জুন ও জুলাই মাসের নতুন ছবিতে দেখা গেছে, তেহরান এটি মেরামত ও পুনর্নির্মাণের পদক্ষেপ নিচ্ছে। জুন মাসে যখন সমঝোতা স্মারক কার্যকর ছিল, তখন স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায় ইরান বোমার আঘাতে তৈরি হওয়া গর্তগুলো অস্থায়ী কভার দিয়ে ঢেকে রেখেছে। পরে জুলাই মাসে সেগুলোর ওপর তারের জাল বসানো হয়।
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়ানোর আরেকটি সন্দেহভাজন স্থান হলো ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’। গত মাসের ছবিতে দেখা গেছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক দিন পরেই সেখানকার সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরে বিভিন্ন যানবাহন আসা-যাওয়া করছে।
বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, এটি সম্ভবত ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন ছিল। তবে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ইসফাহান, ফোরদো এবং নাতাঞ্জের মতো ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো হাত দেওয়া হয়নি।
এর পাশাপাশি ইরান তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রাখার ঘাঁটিতেও কাজ শুরু করেছে। পারমাণবিক সক্ষমতার বাইরেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে।
সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, তেহরান তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিও মেরামত করা শুরু করেছে।
আমেরিকা-ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)
গত জুন মাসে শত্রুতা অবসান এবং যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে একটি বিস্তৃত রূপরেখা চুক্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তিতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা এবং ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া। একই সাথে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সমঝোতা স্মারকে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান পুনর্ব্যক্ত করছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা বিকাশ করবে না। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে মজুত থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন-সাইট ডাউন-ব্লেন্ডিং বা নিষ্ক্রিয় করার জন্য উভয় দেশ একটি পারস্পরিক সম্মত পদ্ধতিতে কাজ করতে রাজি হয়েছে।’
চূড়ান্ত চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক চাহিদার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার কথাও সেখানে উল্লেখ ছিল।
তবে নতুন স্যাটেলাইট চিত্রগুলো এখন এই বড় প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে যে, চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ইরান কি তবে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল?
খুলনা গেজেট/এনএম

