ইতালির ঐতিহাসিক ও নন্দিত নগরী ভেনিস আগামী ২৪ ও ২৫ মে আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসছে। কারণ, এবারের সিটি কাউন্সিল নির্বাচন শুধু একটি শহরের প্রশাসনিক প্রতিনিধি বাছাইয়ের ভোট নয়; বরং এটি ইতালির বহুসাংস্কৃতিক সমাজব্যবস্থা, অভিবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। আর এই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ১৭ জন ইতালীয় নাগরিক, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন।
ইতালিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। গত কয়েক দশকে কঠোর পরিশ্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য, শ্রম ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তারা ইতালীয় সমাজে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। বিশেষ করে ভেনিস, রোম, মিলানসহ বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশিরা এখন পরিচিত এক প্রবাসী সম্প্রদায়। কিন্তু অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদানের তুলনায় ইতালির মূলধারার রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। সেই বাস্তবতায় এবারের ভেনিস নির্বাচন নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন সৈয়দ কামরুল সারওয়ার ও রিতু মিয়া। দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটি সংগঠন, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সৈয়দ কামরুল সারওয়ার ভেনিসের অভিবাসী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে সুপরিচিত নাম। তিনি বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ, নাগরিক অধিকার এবং অভিবাসীদের সমস্যার সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। ফলে নির্বাচনে তার অংশগ্রহণকে অনেকেই একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন রিতু মিয়া। ভেনিসের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি নগর পরিকল্পনা, শিক্ষা, নাগরিক অধিকার ও বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের পক্ষে কাজ করে চলেছেন। বর্তমানে শিক্ষকতাও করছেন। তার রাজনৈতিক অবস্থান মূলত ভবিষ্যৎমুখী—একটি এমন নগর গড়ে তোলার স্বপ্ন, যেখানে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মের মানুষ সমান মর্যাদায় বসবাস করতে পারে।
রিতু মিয়ার ভাষায়, “স্থানীয় রাজনীতিতে আমরা নতুন। কিন্তু আমাদের কাছে নতুন নতুন ধারণা আছে। নগরবাসী যদি আমাদের ভোট দেয়, আমরা তাদের হতাশ করব না।” তার এই বক্তব্য শুধু একজন প্রার্থীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; বরং নতুন প্রজন্মের অভিবাসী নাগরিকদের আত্মবিশ্বাসেরও প্রতিফলন।
এবারের নির্বাচনে ইতালির প্রধান বিরোধী দল Democratic Party সাতজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এটিও ইতালীয় রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো এখন বুঝতে শুরু করেছে যে অভিবাসী জনগোষ্ঠী কেবল ভোটার নয়, তারা নেতৃত্ব দেওয়ারও সক্ষমতা রাখে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন ইতালির সমাজে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
তবে ইতিবাচক এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি উদ্বেগের দিকও রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় কিছু কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠী প্রার্থীদের রাজনৈতিক যোগ্যতা বা নাগরিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন না তুলে তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলছে, এটি নাকি “ভেনিসের নির্বাচন নয়, ইসলামাবাদের নির্বাচন।” এমনকি মুসলিম প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে ভেনিসে “শরিয়া আইন” প্রতিষ্ঠা করা হবে বলেও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রচারণা মূলত ভয়ের রাজনীতি। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গত এক দশকে অভিবাসন, ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, ভেনিসের নির্বাচনেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে কিছু রাজনৈতিক শক্তি অভিবাসীদের সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
ডানপন্থী দল Lega-র কিছু প্রচারণাও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে “মসজিদ নয়” ধরনের স্লোগান ব্যবহার করে তারা মুসলিম অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের বিভাজনমূলক প্রচারণা শুধু মুসলিম সম্প্রদায়কেই আঘাত করে না, বরং ইতালির গণতান্ত্রিক ও বহুসাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

তবে ইতিবাচক দিক হলো, এই উত্তেজনার মধ্যেও অধিকাংশ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী উন্নয়নমূলক ইস্যুকেই সামনে রাখতে চাইছেন। তারা ভেনিসের পরিবেশ রক্ষা, নগর পরিকল্পনা, গণপরিবহন, আবাসন সংকট, শিক্ষা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে কথা বলছেন। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা ভেনিস শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের ভাবনা ভোটারদের আগ্রহের কারণ হয়ে উঠেছে।
ভেনিস এমন একটি শহর, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক আসেন। কিন্তু পর্যটনের অতিরিক্ত চাপ, আবাসন সংকট ও পরিবেশগত ঝুঁকি শহরটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই মনে করেন, নতুন নেতৃত্ব ছাড়া এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ প্রার্থীদের অনেকে তাই নগর ব্যবস্থাপনায় নতুন চিন্তা ও আধুনিক পরিকল্পনার কথা বলছেন।
ভেনিসের সাংবাদিক পলাশ রহমান মনে করেন, এবারের নির্বাচন ইতালিতে অভিবাসীদের রাজনৈতিক পরিপক্বতার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তার ভাষায়, “একসঙ্গে ১৭ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, এটি নিঃসন্দেহে বড় ঘটনা। এটি দেখায় যে অভিবাসীরা এখন শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, ভোটারদের উচিত প্রার্থীদের ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় নয়, বরং তাদের যোগ্যতা, সততা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা। কারণ স্থানীয় সরকারে একজন কাউন্সিলরের কাজ হলো নাগরিক সমস্যার সমাধান করা এবং সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকের কাছেই এবারের নির্বাচন আবেগেরও বিষয়। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করলেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সুযোগ খুব কম ছিল। ফলে নতুন প্রজন্মের এই অংশগ্রহণকে তারা নিজেদের অর্জন হিসেবে দেখছেন। অনেকে মনে করছেন, যদি এই প্রার্থীরা সফল হন, তবে ভবিষ্যতে আরও বেশি বাংলাদেশি তরুণ ইতালির মূলধারার রাজনীতিতে যুক্ত হতে উৎসাহিত হবেন।
এছাড়া এই নির্বাচন ইউরোপের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন ও পরিচয় রাজনীতি বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে জাতীয়তাবাদী ও কট্টর ডানপন্থী শক্তির উত্থান, অন্যদিকে বহুসাংস্কৃতিক সমাজব্যবস্থা ও সমান নাগরিক অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলো। ভেনিসের নির্বাচন সেই দুই প্রবণতার সংঘাতকেই নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে বাস্তবতা হলো, এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীরা সবাই ইতালির নাগরিক, ভেনিসের বাসিন্দা এবং এই সমাজেরই অংশ। তারা এখানকার স্কুলে পড়েছেন, এখানে কাজ করছেন, কর দিচ্ছেন এবং শহরের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। ফলে তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে “বহিরাগত” হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইতালির গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশেরই অংশ।
সব মিলিয়ে, ভেনিসের এবারের সিটি কাউন্সিল নির্বাচন কেবল প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের ভোট নয়; এটি ইতালির সমাজ কতটা বহুত্ববাদকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, অভিবাসী নাগরিকদের কতটা সমানভাবে দেখতে পারে এবং গণতন্ত্র কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের অংশগ্রহণ তাই শুধু একটি কমিউনিটির অর্জন নয়; বরং এটি ইউরোপীয় গণতন্ত্রে বৈচিত্র্য ও সহাবস্থানের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com
খুলনা গেজেট/এনএম

