জার্মানি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, ইউরোপের অন্যান্য স্থানে সেনাসংখ্যা কমানোর হুমকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীর ওপর ইরানের সাম্প্রতিক হামলাকে লঘু করে দেখানোর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো এই যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী পরিণতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর তা হলো প্রধান মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন তাদের ১০ সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে একটি সম্ভাব্য চুক্তির দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড ইউরোপ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল পর্যন্ত ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে নতুন আশঙ্কা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। আর তা হলো, ভবিষ্যতের কোনো সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখা সম্ভব না-ও হতে পারে।
এর প্রতিক্রিয়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ঐতিহ্যবাহী সহযোগী এমনভাবে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত করতে শুরু করেছে, যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষরা এই কৌশলগত সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের এই যুদ্ধ বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে একটি স্থায়ী মোড় ঘুরিয়ে দেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিন্তু বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তার খামখেয়ালি আচরণ, যা মূলত নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিয়েছে, তা মার্কিন জোটগুলোকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে ন্যাটো যেহেতু তার রোষের শিকার হচ্ছে, তাই এই জোট আরো দুর্বল হবে।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের বেপরোয়া মনোভাব কিছু নাটকীয় পরিবর্তনের জন্ম দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।’
২৮ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রমাণ ছাড়াই তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি রয়েছে বলে দাবি করে ইসরাইলের সঙ্গে মিলে ইরানের ওপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে ট্রাম্প ও ইউরোপীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বিশেষভাবে বেড়েছে। হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যা এক অভূতপূর্ব বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি করে। এই সংকটের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো এমন এক যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা তারা কখনো চায়নি।
এর আগেও ট্রাম্প ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে, ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য চাপ দিয়ে এবং ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা কমিয়ে দিয়ে মিত্রদের বিচলিত করেছিলেন। এই সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, জার্মানিতে মোতায়েন থাকা ৩৬ হাজার ৪০০ মার্কিন সেনার মধ্যে থেকে তিনি পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। এর আগে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেন, ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রকে অপমান করছে। তার এ মন্তব্যে ক্ষব্ধ হন ট্রাম্প। এরপর পেন্টাগন জার্মানিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের একটি পরিকল্পিত কর্মসূচি বাতিল করে দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নিজেদেরই গড়া ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্রের থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলে আসছেন ট্রাম্প। ইতালি ও স্পেনে মার্কিন সেনা সংখ্যা কমানোর কথাও বিবেচনা করছেন তিনি। যুদ্ধ নিয়ে এই দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের মতবিরোধে রয়েছেন।
মিত্রদের সঙ্গে বিরোধ
ট্রাম্প অভিযোগ করেন, মিত্ররা ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট পরিমাণে সমর্থন করছে না। এরপরই ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্রের থাকা উচিত কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটো এবং অন্যান্য মিত্রদের প্রতি তার হতাশা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, ইরান যুদ্ধের জন্য ইউরোপে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুরোধ কয়েকটি দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে।
তার মতে, ট্রাম্প বিশ্ব মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করেছেন এবং বিদেশে সম্পর্ক জোরদার করেছেন। তিনি আরো বলেন, কথিত মিত্ররা যাতে যুক্তরাষ্ট্র অন্যায়ভাবে ব্যবহার করতে পারবে না, তা নিশ্চিত করবেন ট্রাম্প।
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে সমর্থন দিতে যারা ব্যর্থ হয়েছে, ন্যাটোর সেইসব মিত্রদের শাস্তি দেওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরেছে পেন্টাগন। এর মধ্যে রয়েছে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটেনের দাবির প্রতি মার্কিন স্বীকৃতির বিষয়টি পর্যালোচনা করা।
এর জবাবে ইউরোপীয় সরকারগুলো নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে যৌথভাবে অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। একই সাথে তারা ট্রাম্পকে আটলান্টিক পারের মিত্রদের সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করছে।
‘মধ্যম শক্তি’ হিসেবে ইউরোপীয়দের হাতে বিকল্প সীমিত, বিশেষ করে রাশিয়ার যেকোনো সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিরোধের জন্য পরাশক্তি মিত্রের ওপর নির্ভরশীল তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৃহত্তর আত্মনির্ভরশীলতায় উত্তরণে কয়েক বছর সময় লাগবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপীয় নেতারা, যাদের মধ্যে কেউ কেউ পূর্ববর্তী সংকট নিরসনে ট্রাম্পকে তোষামোদ করেছিলেন, তারাও এখন তার আলোচনার কৌশল সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন এবং তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আরো সাহসী হয়ে উঠছেন।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির আমেরিকান-জার্মান ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট জেফ রাথকে বলেন, ‘মের্জ সম্ভবত পূর্ববর্তী বৈঠকগুলোতে ট্রাম্পকে মুগ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তার সমালোচনামূলক মূল্যায়ন লুকানোর চেষ্টা করছেন না।’
যখন কিছু ইউরোপীয় নেতা ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, তখন পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি ওয়ারশতে এক সম্মেলনে বলেছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ইউরোপ তার প্রতিশ্রুত সামরিক ব্যয় পূরণ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আতঙ্কিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
তা সত্ত্বেও, মার্কিন জোটগুলোর ওপর চাপ ইউরোপের বাইরেও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
এই সপ্তাহে যখন ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, তখন ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা অনেকটা চোখ বন্ধ করে ছিলেন।
সোমবারের হামলাটিকে ট্রাম্প সামান্য বলে উড়িয়ে দেন, যদিও এতে আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ ফুজাইরাহ তেল বন্দরে আগুন লেগে যায় এবং সরকার স্কুল বন্ধ করতে বাধ্য হতে হয়। এমনকি সপ্তাহের শেষের দিকে আরো হামলার পরেও তিনি জোর দিয়ে বলেন যে এক মাস আগের যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর রয়েছে।
ট্রাম্প কিছু উপসাগরীয় মিত্রেরে পরামর্শ উপেক্ষা করে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। যদিও শিগগিরই সংহতি প্রকাশ করতে এগিয়ে এসেছিল দেশগুলো। তবে এখন কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করতে পারেন যা তাদের একটি বিপজ্জনক প্রতিবেশীর মুখোমুখি করবে।
এই যুদ্ধ এশীয় অংশীদারদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই সংঘাতের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে প্রবাহিত তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক এবং ঐতিহ্যবাহী জোটগুলোর প্রতি অবজ্ঞার কারণে ইতিমধ্যেই বিচলিত। এখন কেউ কেউ ভাবছেন, চীনের সঙ্গে কোনো সংঘাতে, যেমন তাইওয়ান আক্রমণের ক্ষেত্রে, সাহায্য করতে বলা হলে ট্রাম্প হয়তো দ্বিধা করতে পারেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী তাকেশি ইওয়ায়া রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো জোটের মূল অংশীদারযুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস, সম্মান এবং প্রত্যাশা কমে আসছে। এই জোটকে জাপান সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এটি সমগ্র অঞ্চলের ওপর একটি দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে।’
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র রাশিয়া ও চীন মূলত এ থেকে দূরেই থেকেছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন যে তারা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করতে মার্কিন অভিযান এবং ইরান যুদ্ধ চীন ও রাশিয়াকে তাদের প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপ আরো জোরদার করতে উৎসাহিত করতে পারে।
জ্বালানি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান দেশ রাশিয়া। ইরান যুদ্ধের কারণে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মনোযোগ সরে যাওয়ায় লাভবান হয়েছে তারা ।
বিশ্লেষকদের মতে, যদিও ইরান সংকট চীনের জ্বালানি সরবরাহকে সংকুচিত করেছে, বেইজিং হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে ইন্দো-প্যাসিফিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর করতে দেখে এবং বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী কীভাবে মাঝে মাঝে সস্তা ড্রোনের মতো অপ্রতিসম কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়, তা দেখে শিক্ষা লাভ করেছে।
চীন এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে ট্রাম্পের চেয়ে আরো নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
খুলনা গেজেট/এএজে

