ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে যে বিশাল ধাক্কা লেগেছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতিকে বলা হচ্ছে ‘ডিমান্ড ডিকস্ট্রাকশন’ বা চাহিদা ধ্বংস। এর অর্থ হলো, পণ্যের দাম এতটাই বেড়ে যায় যে সাধারণ মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের খরচের অভ্যাস স্থায়ীভাবে বদলে ফেলতে বাধ্য হয়, যা পুরো অর্থনীতির কাঠামোকে নাড়িয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সতর্ক করেছে, ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তেল সরবরাহ সংকটের কারণে এই ‘চাহিদা ধ্বংস’ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। দ্রুত বাড়তে থাকা জ্বালানি তেলের দাম সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও কর ফেরতের (ট্যাক্স রিফান্ড) টাকা শুষে নিচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের জীবনযাত্রায় কোনো বাড়তি খরচ সামলানোর সক্ষমতা নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
আরএসএম ইউএস-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য সময় এখন মোটেও অনুকূল নয়।’
তার মতে, এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ার একটি চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক প্রভাব রয়েছে। যেমন-
১. জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে প্রতিটি পরিবার ও ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত করের মতো চাপ তৈরি হয়।
২. মানুষের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং তারা বিলাসী প্রণ্যের পেছনে খরচ বন্ধ করে দেয়।
৩. গাড়ি বা বাড়ির মতো বড় বিনিয়োগগুলো থমকে যায়।
৪. ব্যবসায়িক মুনাফা কমে যাওয়ায় ছাঁটাই ও খরচ কমানোর হিড়িক পড়ে।
৫. শেষ পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, যা মন্দাকে আরো ত্বরান্বিত করে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় শুধু তেল নয়, সার ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে আগামী কয়েক মাসে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ডেভিড ওর্তেগা জানান, খাবারের দামে এই ধাক্কা পুরোপুরি অনুভূত হতে আরো ছয় মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ ন্যান্সি ভ্যানডেন হাউটেন কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতি এবং তেলের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় চরম বিপর্যয় হয়তো এড়ানো গেছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
সাধারণ আমেরিকানদের জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে। ৩০ বছর বয়সী প্রকৌশলী ব্রায়ান ইতোমধ্যে ঘর থেকে কাজ করা বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং রান্নাঘর সংস্কারের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।
অন্যদিকে, উইলের মতো যারা উবার চালিয়ে সংসার চালান, তারা দূরপাল্লার ট্রিপ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ফিনিক্সের সিয়ান জানান, তেলের দামের কারণে তিনি চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ আজ শেষ হলেও অর্থনৈতিক ক্ষত সহজে শুকাবে না। পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদন প্রাক-যুদ্ধ অবস্থায় ফিরতে কমপক্ষে ছয় মাস সময় লাগবে।
ব্রুসুয়েলাস সতর্ক করে বলেন, নিম্ন আয়ের অনেক আমেরিকান হয়তো আর কখনোই তাদের আগের জীবনযাত্রায় ফিরতে পারবেন না। এটিই এখন তাদের জন্য ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: সিএনএন
খুলনা গেজেট/এএজে

