আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার ঘটনাকে নিজের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন। মাদুরোকে অপহরণের মাধ্যমে একদিকে যেমন তিনি ভেনেজুয়েলার তেল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন একই সঙ্গে কিউবার শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনাও দেখছেন।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, ইরানে ইসরাইলের সঙ্গে তার যৌথ অভিযানও একইভাবে সফল হবে। ইরান থেকে ইসরাইল ও আরব উপদ্বীপের দেশগুলোতে ছোড়া একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হামলা তার বিশ্বাসে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। ট্রাম্পের ধারণা, তিনি জয়কে যেভাবেই সজ্ঞায়িত করুক না কেন দিন শেষে তিনিই বিজয়ী হবেন।
ট্রাম্পের মতে, যুদ্ধের ফলে জ্বালানি বাজারে সাময়িক প্রভাব পড়লেও আমেরিকার অর্থনীতি তা সামাল দিতে সক্ষম হবে। সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হয়ে গেলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে। তার মতে, আমেরিকা তো বটেই বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এই ক্ষতি সামান্যই। বোকা লোকজনই বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ভাবতে পারে।
তেলের দাম বাড়লেও বিশ্বের অন্য উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমেরিকা অনেকটা নিরাপদে রয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দশক থেকেই দেশীয় উৎপাদন বাড়ার কারণে অপরিশোধিত তেলের আমদানি উল্লেখজনকভাবে কমেছে আমেরিকায়। একই সঙ্গে প্রকৃতিক গ্যাস জ্বালানি সরবরাহে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বর্তমানে আমেরিকার মোট জ্বালানির প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে তেল থেকে। যা ১৯৭৩ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধের সময় ছিল ৪৮ শতাংশ। তখন আরব দেশগুলো আমেরিকায় তেল রপ্তানি বন্ধ করেছিল। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে এখন ৩০ থেকে ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবহনের পানিপথ হরমুজ প্রণালি যখন ইরান বন্ধ করে দেয় তখন ইউরোপের তেলের বাজারে একপ্রকার ভূমিকম্প শুরু হয়। একই সঙ্গে কাতার যখন তরলীকৃত গ্যাস উত্তোলন বন্ধ করে তা ইউরোপে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। অথচ আমেরিকার অর্থনীতিতে তার প্রভাব সামান্যই।
কিন্তু ট্রাম্প যতই আত্মবিশ্বাসী থাকুন না কেন, তিনিও পরাজয়ের মুখোমুখি হতে পারেন। আর তা ইরানের মতো তুলনামূলক কম শক্তিধর দেশের কাছে নয় বরং এমন এক শক্তির কাছে যা বহুবার আমেরিকার সামরিক অভিযানে লাগাম টেনে ধরেছে। আর তা হলো দেশটির জনগণের বিরোধিতা। কেননা ইরানে আমেরিকার হামলা দেশটির সাধারণ জনগণের কাছে অজনপ্রিয়। আর যুদ্ধের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অজনপ্রিয়তা আরো বাড়তে থাকে।
আমেরিকার জ্বালানি স্বনির্ভরতা থাকলেও তারা পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়। ইতোমধ্যে আমেরিকায় পেট্রোলের দাম ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, গ্যালনপ্রতি ৩.৫০ ডলারেরও বেশি। সরকারের পূর্বাভাস বলছে, খুচরা পেট্রোলের দাম ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত লাগতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষি পণ্য উৎপাদনে খরচ বাড়বে, একই সঙ্গে বাড়বে বিমান ভাড়াও। এর ফলে বাড়বে মুদ্রাস্ফীতি। যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২.৪ শতাংশ।
ট্রাম্প এসব ঝুঁকির কথা বিবেচনা করেই তেলের দাম কমাতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন। সরকার জ্বালানিবাহী জাহাজগুলোকে বিমা দেওয়ার এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ান তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে এবং ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর উপায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে তেলের সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নাও হতে পারে। এর ফলে আমেরিকার কাছে দুটি পথ খোলা আছে, হয় তাদের যুদ্ধ শেষ করতে হবে, নয়তো ইরানের সক্ষমতা এমনভাবে ধ্বংস করতে হবে যাতে দেশটি আর হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলবাহী জাহাজকে হুমকি দিতে না পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, একদিকে তিনি তেহরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আশা করছেন, আবার অন্যদিকে দাবি করছেন যে যুদ্ধ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের বোঝা উচিত, আকাশ থেকে বোমা বর্ষণ করে একটি দেশকে ধ্বংস করলেও দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ জেতা যায় না।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড সহজে হার মেনে নেবে না। বরং তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। দেশটির অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও এখনো হাজারো সশস্ত্র যোদ্ধা রয়েছে, যারা পাল্টা লড়াই করতে এবং তেহরানে শাসন টিকিয়ে রাখতে সক্ষম।
ট্রাম্প চাইলে ইরানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি থেকে সরে এসে অন্য কোনো যুক্তি দাঁড় করিয়ে বিজয় দাবি করতে পারেন এবং নৌবহর ফিরিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু সেটিও খুব ভালো দেখাবে না। অন্যদিকে তিনি স্থলবাহিনী মোতায়েন করতে পারেন।
কিন্তু এসবের কোনো কিছুই দ্রুত ফল দেবে না। বরং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর তখন ট্রাম্প হয়তো বুঝতে পারবেন, মাদুরোকে আটক করা যত সহজ বিশ্বের সব জায়গায় একই কৌশল অবলম্বন করে সফলতা পাওয়া ততটা সহজ নয়।
খুলনা গেজেট/এএজে

