রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছেন বলে বিস্ফোরক দাবি করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়ে নয়, বরং কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমেই রাশিয়াকে থামানো সম্ভব। যুদ্ধবিরতির নামে কোনও কৌশলগত ছাড় দিতে রাজি নন জানিয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ইউক্রেন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা রক্ষা করেই বিজয় অর্জন করবে।
রাজধানী কিয়েভের সুরক্ষিত সরকারি কমপ্লেক্সে সপ্তাহান্তে সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেন, ইউক্রেন পরাজয়ের পথে নয়; বরং শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই যুদ্ধ শেষ হবে। তার ভাষায়, যুদ্ধবিরতির নামে রাশিয়ার শর্ত মেনে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দেয়ার মানে হবে এমন ভূখণ্ড ত্যাগ করা, যা রাশিয়া বিপুল সেনা হারিয়েও দখল করতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, পুতিন ইতোমধ্যেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, তিনি কতদূর এগোতে পারবেন এবং আমরা তাকে কীভাবে থামাবো। রাশিয়া বিশ্বের ওপর ভিন্ন এক জীবনধারা চাপিয়ে দিতে চায়, মানুষ যে জীবন নিজেরা বেছে নিয়েছে তা বদলে দিতে চায়।’
রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেন যেন দোনেৎস্ক অঞ্চলের অবশিষ্ট ২০ শতাংশ তাদের হাতে তুলে দেয়। ইউক্রেন এই অঞ্চলগুলোর কিছু শহরকে ‘দুর্গনগরী’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। পাশাপাশি খেরসন ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের আরও কিছু এলাকা ছেড়ে দেয়ার কথাও বলছে মস্কো। যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে এ দাবিকে যুক্তিসঙ্গত বলা যায় কি না— এ প্রশ্নে জেলেনস্কি বলেন, বিষয়টি কেবল ভূখণ্ড নিয়ে নয়।
তার মতে, ‘এটা শুধু ভূমি হস্তান্তর নয়। এর অর্থ হবে আমাদের অবস্থান দুর্বল করা এবং সেখানে বসবাসকারী লাখো মানুষকে কার্যত ছেড়ে দেয়া। এতে সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়বে’। তিনি মনে করেন, এমন ছাড় পেলে পুতিন সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট হতে পারেন। কিন্তু সেটি হবে কেবল বিরতি নেয়ার সুযোগ।
জেলেনস্কির দাবি, ‘তিনি (পুতিন) পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করবেন। আমাদের ইউরোপীয় অংশীদাররা বলছেন তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। আমার ধারণা, তার চেয়েও কম সময় লাগতে পারে। এরপর তিনি কোথায় যাবেন আমরা জানি না, তবে তিনি যে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইবেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।’
সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি মূলত ইউক্রেনীয় ভাষায় কথা বলেন। কিয়েভে প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রবেশের আগে কড়া নিরাপত্তা তল্লাশি ছিল চোখে পড়ার মতো। যুদ্ধরত দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি অবশ্য আগেই রাশিয়ার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন।
বিনোদন জগত থেকে রাজনীতিতে আসা জেলেনস্কি ২০০৬ সালে ইউক্রেনের ‘স্ট্রিক্টলি কাম ড্যান্সিং’ প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে একটি টেলিভিশন কমেডিতে তিনি অপ্রত্যাশিত প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং এরপর বাস্তবেই দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বর্তমান সংকটেও তাকে দৃঢ় ও সহনশীল বলে মনে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি জেনেভায় যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরুর আগে বলেন, ‘ইউক্রেনের দ্রুত আলোচনায় বসা উচিত’। পশ্চিমা কূটনীতিকদের মতে, ট্রাম্প মনে করেন যুদ্ধবিরতির পথ খুলতে ইউক্রেনকে ভূখণ্ডগত ছাড় দিতে হবে। হোয়াইট হাউসের বাইরের অনেক বিশ্লেষকও মনে করেন, মস্কোকে ছাড় না দিলে ইউক্রেন শেষ পর্যন্ত টিকতে পারবে না।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে জেলেনস্কি পাল্টা বলেন, ‘আপনি এখন কিয়েভে, আমাদের রাজধানীতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা কি হারছি? না। আমরা আমাদের স্বাধীনতার জন্য লড়ছি’। তার মতে, পুতিনকে এখনই থামানো গেলে সেটিই হবে বৈশ্বিক বিজয়। তিনি ইউক্রেনেই থামবেন না।
সব ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারই কি বিজয়? জবাবে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা তা করব, এটা সময়ের ব্যাপার। কিন্তু এখনই করতে গেলে লাখো মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। বড় সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হয়ে তার মূল্য দিতে হবে। মানুষ ছাড়া ভূখণ্ডের কোনও মানে নেই।’
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের সীমান্তে ফিরে যাওয়া শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, ন্যায়বিচারের প্রশ্নও। আমাদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখাই ইউক্রেনের বিজয়। আর সব ভূখণ্ড ফিরে পাওয়া বিশ্বব্যাপী ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা।
এক বছর আগে হোয়াইট হাউসে সফরে গিয়ে জেলেনস্কি প্রকাশ্যে সমালোচনার মুখে পড়েন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সর সঙ্গে সেই তর্ক বিশ্বমাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়। অনেকেই সেটিকে প্রকাশ্য কূটনৈতিক চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে দেখেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আমলের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনের অধ্যায় শেষ হয়েছে।
এরপর থেকে জেলেনস্কি প্রকাশ্যে সংঘাতে না জড়ানোর কৌশল নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহায়তা প্রায় বন্ধ করলেও গোয়েন্দা সহায়তা চালু রেখেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কিনে ইউক্রেনকে দিচ্ছে। ট্রাম্প একসময় জেলেনস্কিকে ‘স্বৈরশাসক’ আখ্যা দিয়েছিলেন এবং যুদ্ধ শুরুর দায় তার ওপর চাপিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি স্বৈরশাসক নই, যুদ্ধও আমি শুরু করিনি।’
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি কংগ্রেসে অনুমোদিত হতে হবে, যাতে প্রেসিডেন্ট বদলালেও তা বহাল থাকে। প্রেসিডেন্ট পরিবর্তিত হন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র চায় আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে ইউক্রেনে সাধারণ নির্বাচন হোক। জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধ চলাকালে জারি করা সামরিক আইনের কারণে ২০২৪ সালের নির্বাচন হয়নি। নির্বাচন আয়োজন করতে হলে আগে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘যদি যুদ্ধ শেষের শর্ত হয় নির্বাচন, তাহলে আমরা প্রস্তুত। তবে তা এমনভাবে হতে হবে, যা ইউক্রেনের জনগণ বৈধ বলে মেনে নেবে এবং আপনারাও স্বীকৃতি দেবেন।’
খুলনা গেজেট/এনএম

