অবশেষে ‘থলের বিড়াল’ বেরিয়ে পড়লো। বাংলাদেশকে কুৎসিতভাবে লুণ্ঠনকারী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা তার শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে ভারতের সাথে একশ’ একটি অসম অযৌক্তিক গোপন চুক্তি করে গেছেন। যা দেশের সার্বভৌমত্ব-স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি প্রচণ্ড হুমকি স্বরূপ। হাসিনার পলাতক নির্বাসিত জীবনের ২৬ মাসের মাথায় সব ধরনের ভারত বাংলাদেশ অসম গোপন চুক্তি গুলো দারুণ বিষাক্ত চর্ম রোগের মত জেগে উঠেছে। বর্তমান সরকার ও দেশ জাতিকে এই চুক্তিগুলো বেশ হুমকির মধ্যে ফেলেছে। এ ধরনের গোপন চুক্তিগুলো এখন প্রকাশিত হওয়ায় গোটা বাংলাদেশের মানুষ দারুণভাবে বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন। ১০১ টি চুক্তি নবায়নের জন্য ভারতের দৌড় ঝাপ যেকোনো সিনেমা সিরিজকেও হার মানাবে।
ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষা লগ্ন থেকে পুরো অর্ধ শতাব্দীকাল এদেশের বুকে অদৃশ্য শোষণ এবং লুণ্ঠন কারবার নির্বিবাদে চালিয়েছে। এদেশের প্রশাসন, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প সংস্কৃতি সবকিছু ধ্বংস করেছে, এক এক করে। বিদ্যুৎ এবং পানির মত নৈমিত্তিক ব্যবহার্য জিনিসগুলোও নিজেদের হাতে রেখে গোটা জাতিকে জিম্মি করে রেখেছিল আদানী গ্রুপ এবং গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রক্রিয়ার মধ্যে। শেখ মুজিব ১৯৭১ এর ৭ই মার্চে ঐতিহাসিক ভাষণের এক স্থানে পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “ওরা আমাদের ভাতে মারতে চায় পানিতে মারতে চায়” স্পষ্টভাবে শেখ মুজিবের সেই ভাষণ এখন রূপকথায় পরিণত হয়েছে! কিন্তু ভাষণ তো ভাষণই।
আমরা যদি ভারতের দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো, ভারত আমাদের প্রতিবেশী বন্ধুদেশ নামের আড়ালে চির বৈরী, তা’ যুগের পর যুগ চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের পাতা ফাঁদে প্রতিনিয়ত আটকে যাচ্ছি। ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত যতবার সরকার বদলেছে, কি এক অজ্ঞাত কারণে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের প্রত্যেক সরকারের দুর্বলতা মোটেও কাটছে না। তবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার প্রাণপণে ভারতের আধিপত্যবাদের থাবা থেকে, স্বার্থবাদী চুক্তির বলয় থেকে বিনা দ্বিধায়, বিনা বাধায় বেরিয়ে আসার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছে। সেখানেও দেশ-বিদেশের এবং দেশের অভ্যন্তরের ষড়যন্ত্র চলছে অব্যাহত। বলা বাহুল্য, ভারতের মতো কর্তৃত্ব পরায়ণ লোভী একটি স্বার্থবাদী দেশ বাংলাদেশকে বছরের পর বছর ক্রমাগত শাসন এবং লুণ্ঠন করে চলেছে। আমাদের প্রতি অ-ন্যায্য আচরণ করেছে। ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে পাখির মত গুলি করে বাংলাদেশের মানুষজন হত্যা করেছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন ভারতের দোসর ছিল শেখ হাসিনা নামক ফ্যাসিস্ট ডাইনি। এখন একশ’ একটি ভারত বাংলাদেশ অসম গোপন চুক্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোয় দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কোটি কোটি মানুষ এ খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। ভারতের সাথে হাসিনা আমলে যে ১০১ টি গোপন চুক্তি করা হয়, বর্তমান তারেক রহমান সরকার শক্তির ধারা গুলো প্রত্যেক ফাইল থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিরীক্ষণ করছেন। দেশের স্বার্থের পরিপন্থি কোন চুক্তি নবায়ন ব্যাপারে সরকার অধিক মাত্রায় সতর্ক। সরকার এ ব্যাপারে নিজস্ব কৌশল ও স্ট্র্যাটেজি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে বোমা ফাটিয়েছেন বর্তমান সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, ‘কোনো নবায়ন নয়, গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে নতুন চুক্তি চায় বাংলাদেশ’।
পানি সম্পদ মন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি বলেছেন, গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে পুরোনো চুক্তির কোন নবায়ন হবে না, বর নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লোজ রাখার পাশাপাশি প্রথমে অবশ্য দেশের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। স্মরণ করা যেতে পারে ১৯৭১ এর ১৬ ই ডিসেম্বর নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের শেষে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু ছদ্মবেশী সে বিজয় ছিল, পিণ্ডি কে ছেড়ে দিল্লির দালালি এবং গোলামির বিজয়। জাতি ৫০/৫৫ বছর পর প্রশ্নের মুখোমুখি ওই বছরের বিজয় ছিল কার বিজয়? তাকি ‘ভারতের বিজয়’ নাকি বাংলাদেশ পিনডির কাছ থেকে তথাকথিত মুক্তি পেয়ে পুনরায় কি দিল্লির কাছে বন্দী হওয়া বিজয়? পেয়েছিল? এখন একেবারেই স্পষ্ট হয়েছে, ভারত ১৯৭১ এ মেকি সাহায্যকারী হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে যে লোক দেখানো সাহায্য করেছিল, তা ছিল পাকিস্তান থেকে তার একটি অংশকে ভারতের অনুকূলে বিচ্ছিন্ন করে ‘চিরস্থায়ী বাজার’ তৈরি করা। ভারত সেই কাজটি করেছে ধীরে ধীরে ১৯৬২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ষোলো কলায় পূর্ণ করেছে!
শেখ মুজিবের ছয় দফা পূর্ব বাংলার তথাকথিত মুক্তি সনদ(?) ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ১৯৭২ এর শেষে রক্ষী বাহিনী নামক প্রাইভেট বাহিনী গড়ে তুলে ভারতের ইশারায় শেখ মুজিবের দেশ শাসনে সমালোচনা কারি ভিন্নমতের যুব তারুণ্য এবং প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠে স্তব্ধ করে দেওয়া। যার পরিণাম হিসেবে ১৯৭৩ এর শেষ থেকে ১৯৭৪ এর বাংলাদেশ বিজয় (?) এর তিন বছরের মধ্যে সারাদেশব্যাপী কঠিন দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়া! সমগ্র দেশব্যাপী লোক দেখানো ৪৩০০ ইউনিয়নে নোঙ্গরখানা খোলা হয়েছিল, সেসময় ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় থাকা দস্যুদের যুবতী মেয়েদের লঙ্গরখানায় রুটি আনতে গেলে রুটির সাথে সাথে যাতে ইজ্জত লুণ্ঠন করা যায়! এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের লুটপাট এর ফলে বাজার অর্থনীতি ভেঙে পড়ার ফল। সারাদিন পরিশ্রম করে বাজারে গিয়ে কোনো শ্রমজীবী মানুষ চাল পায় নাই। বাজার থেকে চালু উধাও বাজারীদের গোপন হাতের ছোঁয়ায়। রক্ষী বাহিনী ১৯৭৪ সালে প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করার জন্য অত্যাচারের স্ট্রিম রোলার চালায় বেপরোয়া ভাবে হত্যা গুম ক্রসফায়ার ইত্যাদি শুরু করে। এই ক্রসফায়ারের প্রথম শিকার সিরাজ শিকদার একজন বামপন্থী বিপ্লবী দলের সংগঠক। আমরা পুরোনো প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ওই সময় দিল্লির নির্দেশ তামিল করা শেখ মুজিব বুঝে ফেলেন ভাটির দেশে চাষাবাদ এবং কৃষি অর্থনীতি জীবন্ত রাখতে হলে পানির ন্যায্য হিস্যা দরকার।
শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে উভয় দেশের পানি সম্পদ মন্ত্রীদের লোক দেখানো ফাইল নাড়াচাড়া ও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের সাথে গ্যারান্টি ক্লজ হিসেবে শুকনো মৌসুমে ৪৪ হাজার কিউসেক পানি বণ্টনের চুক্তি হয়। সেই ধারাবাহিকতা শেখ মুজিব আমলে চলতে থাকে। পরে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পথ ধরে ১৯৭৮-৭৯ সময়ে জিয়াউর রহমান সরকার আমলেও ভারত বাংলাদেশকে ৪৪ হাজার কিউসেক গঙ্গার পানি বণ্টন করে। পরে অবশ্য ভারত প্রায় ভুলে যায় যে ভাটির দেশ বাংলাদেশকে ন্যায্য হিস্যা হিসেবে কিউসেক পানি শুকনো মৌসুমে দিতে হবে।
১৯৮২-৮৩ সালের দিকে জাতীয় পার্টি সরকার আমল থেকে ভারত বাংলাদেশ গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে টালবাহানা শুরু করে যায় এখনও পর্যন্ত চলে আসছে। ২০০৯ সালে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই সময় থেকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ‘খেলারাম খেলে যা’ স্টাইলে ভারত একতরফাভাবে পানি নিয়ে যা ইতরামি কালবার করেছে, তা বলা নিষ্প্রয়োজন! শুকনো মৌসুমে ভারত ভাটির দেশ বাংলাদেশকে তাদের পাওনা ন্যায্য হিস্যা পানি না দিয়ে প্রায় ২০-২৫ বছর উত্তরবঙ্গকে মরুভূমিতে রূপান্তরিত করেছে। পানি নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে শুকনো মৌসুমে গঙ্গার পানি প্রবাহ আটকে দেওয়ায় বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলীয় বিশাল কৃষি নির্ভর এলাকা রংপুর দিনাজপুর অর্থাৎ তিস্তার পাড়ের মানুষেরা বিপন্ন অবস্থায় পড়ে। ঐ সময় তিস্তা শুকিয়ে চৌচির হয়ে পড়ে এবং ফসল উৎপাদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। ভারতের সাথে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের বন্ধুত্বের নামে দাসত্বের সম্পর্কের কারণে বাইরে বন্ধুত্বের মুখোশ পরে ভারত পানি নিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জুয়া খেলছে।
এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের মানুষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের মাধ্যমে ইলিয়াস আলী নিখোঁজ এবং তিস্তা পাড়ের মানুষের ন্যায্য পানি প্রবাহের অধিকার চায় ভারত কর্তৃক সৃষ্ট এই অনিয়মের বিচার চায়। ভারত একতরফাভাবে শ্রাবণ/ভাদ্র মাসে গজল ডোবায় ১০৯ টি গেট খুলে দিয়ে কি বছর বন্ধুত্বের নমুনা হিসেবে বাংলাদেশে বন্যা সৃষ্টি করে। অপরদিকে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে খরা মৌসুমে ভারত বাংলাদেশের পানি অস্ত্রের ট্রাম কার্ড নিয়ে ইচ্ছামতো খেলে। এ ধরনের চিরন্তন অবস্থার বিরুদ্ধে বর্তমান পানি সম্পদ মন্ত্রী মোঃ শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এনি মিসাইল ছুড়ে বলেছেন, হাসিনার সাথে করা গঙ্গার পানি চুক্তির আর নবায়ন নয়, বরং ভারতের কাছে বাংলাদেশ আর দাদাগিরি দেখতে চায় না। বরং ভারত বাংলাদেশ পানি বিষয়ক নতুন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের পাওনা ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিতে চায়।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

