শিল্প ও বন্দর নগরী খুলনা উত্তপ্ত। ৬৯ ও ৯০ এর উত্তরসূরিরা রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে। ছাত্র সমাজের কণ্ঠে স্লোগান ‘সারা বাংলায় খবর দে কোটা প্রথার কবর দে’। ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইকে ফিরিয়ে দে’। ‘কোটা না মেধা, মেধা, মেধা’। এ স্লোগান সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কোটা প্রথা বাতিলে দাবিতে সকল শিক্ষার্থীর সমবেত কণ্ঠে শ্লোক তোলে। এ অঞ্চলের মানুষকে সহজে শিক্ষার্থীরা কাছে টানে। শিববাড়ি, জিরো পয়েন্ট, সাচিবুনিয়ার মোড়, খবির গেট, গল্লামারি ও ময়লাপোতা হয়ে ওঠে আন্দোলনের পাদপীঠ।
এ আন্দোলনের একটি দিন ২ আগস্ট। ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার জন্য পরিবারের সদস্যরা আমাকে আটকিয়ে রাখে। এক পর্যায়ে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আন্দোলনের কাফেলায় শরিক হই। আইভি আপুর বাসায় যেতে সংবাদ আসে জিরো পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে হামলা হয়েছে। দ্রুত বের হয়ে রাস্তায় আসতে অটো রিকশা চালক আমাকে তুলে নিয়ে গন্তব্যের দিকে রওনা হয়, তিনি ভাড়া নেয়নি। গল্লামারি প্রবেশ করা যাচ্ছে না। পায়ে হেঁটে বিকল্প রাস্তা দিয়ে জিরো পয়েন্টে উপস্থিত হয়ে দেখলাম গুলি ও টিয়ার শেল। অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। গল্লামারি ও জিরো পয়েন্ট পুলিশের নিয়ন্ত্রণে। শিববাড়ির দিকে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়নি।
দুপুর ১টার পর মাঝারি বৃষ্টি, এরপর পুলিশের টিয়ারশেল ও বুলেট সবার শরীর পুড়ে যাচ্ছিল, নিশ্বাস বন্ধ হয় হয়। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়। সে সময় রাস্তার দুই পাশের পথচারীরা আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানায়। কেউ কেউ শুকনো কাপড়, খাবার ও পানির বোতল দিয়ে সহযোগিতা করেন। অনেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে টুথপেস্ট তুলে দেয়, তা ব্যবহারে গায়ের লোমকূপ ও চোখের পানি পড়া নিরসন হয়। এর একটি অধ্যায় বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন সোনাডাঙ্গা থানা ঘেরাও করে। এ কর্মসূচি শেষে আন্দোলনকারীরা ময়লাপোতা থেকে শিববাড়ি দিকে রওনা হওয়ার সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে। এক পর্যায়ে সতীর্থ মাহির বাসায় গিয়ে উঠলাম। আমার আন্দোলনের অপর সহযোগী পুস্পিতা ও অন্যান্যরা আমাকে বিভিন্নস্থানে খুঁজে বেড়ায়।
মধ্য জুলাইয়ে শিক্ষার্থীরা বইখাতা ফেলে শিববাড়ি মুখী হয়। এর একটি দিন ১৫ জুলাই টেলিভিশনের পর্দায় জাহাঙ্গীর নগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হামলার খবর দেখতে পাই। পূর্বসূরিদের কাছ থেকে শোনা ৬৯ ও ৯০-এর ন্যায় শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে এসে নগরীর পথে পথে নানা স্লোগান দেয়। পর্যায়ক্রমে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে কুয়েট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুমেক, বিএল কলেজ, সিটি কলেজ, পলিটেকনিক, মহিলা কলেজ, সুন্দরবন কলেজ, কমার্স কলেজ, দৌলতপুর মুহাসিন কলেজ, জিলা স্কুল, সেন্ট যোসেফস, করোনেশন, বিকে, মডেল ও ইকবালনগরের শিক্ষার্থীরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। রাজপথে আন্দোলনকারীদের দমানোর জন্য নিয়োজিত সেনাবাহিনী, বিজিবি, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, র্যাব ও পুলিশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ৩ আগস্টের পর থেকে তারা ছাত্রদের মিছিলে হামলা করতে গুলি করতে অনীহা প্রকাশ করে। ৪ আগস্ট খুলনায় খবর এসে পৌঁছায় আন্দোলনের দাবানল সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। শাসক গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। এরই এক অধ্যায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিস ও শেখ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ হয়। ৫ আগস্ট ইন্টারনেটের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে সরকার প্রধান দেশ ত্যাগ করেছে। শিববাড়ি মোড়ে বিজয়ী ছাত্র জনতার মিলন মেলায় পরিণত হয়। সকলের পক্ষকালের ক্লান্তি দূর হয়। স্বৈরশাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিজয় হয়।
লেখক : জুলাই যোদ্ধা।
খুলনা গেজেট/এনএম

