বুধবার । ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ । ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩

মুক্তিযুদ্ধে খুলনার আইনজীবী সমাজ

কাজী মোতাহার রহমান

খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির বয়স ১৪২ বছর। বৃটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে শত আন্দোলনের ঐতিহ্যের দাবিদার এ আইনজীবী সমিতি। বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচন, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র গণ অভ্যুত্থান ও ২০২৪-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খুলনার আইনজীবীদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।

১৯৭০ সালে খুলনায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের অধিকাংশই ছিলেন আইনজীবী। ৭০’র নির্বাচনে খুলনা-১ আসন থেকে এ্যড. শেখ আব্দুল আজিজ, খুলনা-৬ আসন থেকে এ্যড. সালাউদ্দিন ইউসুফ ও খুলনা-৭ আসন থেকে এ্যড. মোঃ আব্দুল গফফার জাতীয় সংসদ সদস্য, খুলনা-৬ আসন থেকে এ্যাড. হাবিবুর রহমান খান, খুলনা-৮ আসন থেকে এ্যড. মোঃ এনায়েত আলী সানা, খুলনা-৯ আসন থেকে এ্যড. মোঃ মোমিন উদ্দিন আহমেদ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সাতক্ষীরা থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য স ম আলাউদ্দিন পরবর্তীতে আইন পেশায় সম্পৃক্ত হন।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেঃ আগা ইয়াহিয়া খান নির্বাচন পরবর্তী বিজয়ীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে। খুলনার তৎকালীন ছাত্রসমাজ ক্ষুব্দ হয়ে ওঠে। একই সাথে স্বাধীনতা প্রত্যাশী আইনজীবীরা অসহযোগ আন্দোলনের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে। এক পর্যায়ে গড়ে ওঠে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের খুলনা জেলা কমিটি। এ কমিটির নেতৃত্বে হাদিস পার্কে প্রথম পতাকা উত্তোলনসহ অসহযোগ আন্দোলন সফল হয়। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হলে সাউথ সেন্ট্রাল রোডের অধিবাসী এ্যাড. নকুলেশ^র চক্রবর্তীকে পাক বাহিনী হত্যা করে। জাতীয় পরিষদের সদস্য এ্যাড. শেখ আব্দুল আজিজ, এ্যাড. সালাউদ্দিন ইউসুফ, প্রাদেশিক পরিষদের এ্যাড. মোমিনুদ্দিন আহমেদ ও এ্যাড. এনায়েত আলী সানা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে বিভিন্ন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণে উদ্বুদ্ধ ও পরামর্শ দেন। বিশেষ করে আগষ্ট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাত্র সমাজ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তারা বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকবাহিনী ও রাজাকারদের পরাজিত করে।

যুদ্ধ চলাকালীন আতঙ্কের মধ্য দিয়ে আদালতের কার্যক্রম চলে। সার্কিট হাউসের হেলিপ্যাডের পূর্বপাশের ভবনে পাক বাহিনী বাঙালীদের হত্যা করত। তাদের চিৎকার শুনে তৎকালীন জেলা জজ প্রতিবাদ করেন। এক পর্যায়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। পাক বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে শহীদ আইনজীবীরা হচ্ছেন তৎকালীন জেলা ন্যাপের সভাপতি আব্দুল জব্বার সরদার, নকুলেশ্বর চক্রবর্তী, আইয়ুব আলী, গোলাম সাইদ মোক্তার। ন্যাপ নেতা আব্দুল জব্বারের লাশ পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সাথে দ্বিমত পোষণ করে পাকিস্তান বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করেন সাতক্ষীরা জাতীয় পরিষদ সদস্য এ্যাড. আব্দুল গফ্ফার ও খুলনার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হাবিবুর রহমান খান। শহরের বাইরে থেকে মুক্তিযোদ্ধারা যেমন তৎপর ছিলেন তেমনি তৎপর ছিলেন মুসলিম লীগ, পিডিপি, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামী ইসলামীর দর্শনে বিশ্বাসী আইনজীবীরা। তাদের বড় একটি অংশ শন্তি কমিটিতে অর্ন্তভুক্ত হন। এ কমিটির সদস্যরা স্বাধীনতা প্রত্যাশীদের বিরোধিতার পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্য দিয়ে পাকবাহিনীকে সহযোগিতা করত। শান্তি কমিটির অন্তর্ভুক্ত হলেও বাঙালিদের ওপর নির্যাতন দেখে পাকিস্তান সরকারের কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী এ এইচ দেলদার আহমেদ ও জেলা ন্যাপের সভাপতি এ্যাড. আব্দুল জব্বার সরদার পদত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা, পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার পক্ষে অবস্থান এবং পাকবাহিনীকে নানাভাবে সহযোগীতার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী ট্রাইব্যুনালে স্থানীয় আইনজীবী এওয়াই আহমদ আলী ও ব্যারিষ্টার আহাদ আলী খানের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়।

খুলনার দামাল ছেলেরা পাইকগাছা, দেবহাটা, কপিলমুনি, বারোআড়িয়া ও শিরোমনি বিভিন্ন স্থানের যুদ্ধে অংশ নিয়ে শত্রু সেনাদের পরাজিত করে। ৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর খুলনা শত্রুমুক্ত হয়। এদিন দুপুর ১টা নাগাদ জেলা জজ কোর্টের সামনে হেলিপ্যাডে পাকিস্তান বাহিনীর খুলনা অঞ্চলের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হায়াতখান মিত্র বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল দলবীর সিং-এর কাছে আত্মসমর্পন করেন। বিশেষ অধ্যায় উল্লেখ করতে হয়, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পর খুলনায় প্রথম আত্মসমর্পন দলিলে স্বাক্ষর করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা পরবর্তীতে আইন পেশার সাথে সম্পৃক্তরা হচ্ছেন স ম বাবর আলী, ইস্কান্দার কবীর বাচ্চু, কাজী আব্দুস সালাম, কাজী হারুন অর রশিদ, গাজী আব্দুল বারী, আব্দুল মালেক, আ ফ ম মহসীন, সৈয়দ শহীদুল আলম, প্রয়াত চিশতী সোহরাব হোসেন শিকদার, হরেন্দ্র নাথ মন্ডল, আব্দুস সবুর মোল্লা, গোলাম সরোয়ার মল্লিক, আ ব ম নুরুল আলম, জিএম কেরামত আলী, এমএম মুজিবুর রহমান, প্রয়াত আব্দুস সাত্তার শেখ, প্রয়াত আবুল কালাম আজাদ, মোঃ কামরুল আহসান, শেখ মোহাম্মাদ আলী, সিদ্দিকুর রহমান, শেখ মেঃ আব্দুর রশীদ, প্রয়াত শাহনেওয়াজ দিলু, এস এম হেমায়েতুল ইসলাম, সরদার জাহাঙ্গীর আলম, এস এম নাসিরউদ্দিন আহম্মদ, প্রয়াত এম ফিরোজ আহমেদ, স ম ইউসুফ, রবিউল ইসলাম তরফদার, স্বর্গীয় মনোরঞ্জন দাস, সেখ মোহাম্মদ আলী অসিত কুমার হাওলাদার, খান মনিরুজ্জামান, আব্দুল হালিম মোল্লা, স ম আলাউদ্দিন। মুক্তিযোদ্ধার পরে তৎকালীন সরকার সত্তরেরর জাতীয় পরিষদ সদস্য এ্যাড. শেখ আব্দুল আজিজ, এ্যাড. সালাউদ্দিন ইউসুফ, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এ্যাড. মোঃ এনায়েত আলি সানা, এ্যাড. মোমিন উদ্দিন আহম্মেদকে মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা দেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে, মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

খুলনার আইনজীবীদের ভাষা আন্দোলনে, ৬৯, ৯০ ও ২৪-এর গণঅভ্যূত্থানে সর্বপরি ৭১-এর যুদ্ধে গর্বিত ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে। তাদের ত্যাগ, মেধা এবং জীবনকে বাজি রেখে যুদ্ধে অংশ নেওয়া খুলনাবাসী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

(তথ্যসূত্র : খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির টেলিফোন নির্দেশিকা, আইনজীবী সমিতির ভবনের দোতলায় মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলক, স ম বাবর আলী রচিত স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান, গৌরাঙ্গ নন্দী রচিত বৃহত্তর খুলনার মুক্তিযুদ্ধ ও ড. শেখ গাউস মিয়া রচিত মুক্তিযুদ্ধে জেলা খুলনা, বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. স ম বাবর আলী, এম এম মুজিবর রহমান ও আ ব ম নুরুল আলমের বিভিন্ন সময়ের বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার।)

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন