বৃহস্পতিবার । ৯ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২৬শে চৈত্র, ১৪৩২

জ্বালানী সংকট নিরসনে বাইসাইকেল ব্যবহার : একটি সবুজ ও স্বাস্থ্যকর সমাধান

ফাতেমা তুজ জোহরা

মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জ্বালানি তেল তথা জীবাশ্ম জ্বালানি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যাতায়াত, শিল্প কারখানার কার্যক্রম, বিদ্যুৎ উৎপাদন-প্রতিটি ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল সরাসরি ব্যবহার হয়। এছাড়া বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে যেখানে অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তিই কৃষি কাজ সেখানে ফসল উৎপাদনের জন্য সেচকাজ পরিচালনা করতেও জ্বালানি তেল দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি বর্তমানে আমাদের আমদানিনির্ভর জাতীয় অর্থনীতিতে জটিল প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাইসাইকেলকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান বাহন হিসেবে চালু করা যেতে পারে। জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ রক্ষা এবং স্বাস্থ্য উন্নয়নের এক শক্তিশালী হাতিয়ার।

বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বিপুল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতসহ আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় তেলের দাম বেড়েছে, সরবরাহ কমেছে। ফলে মোটরসাইকেল ও গাড়ির মালিকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কিনছেন, কখনো কখনো খালি হাতে ফিরছেন। মোটরসাইকেল বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত নয়, অর্থনৈতিকও। পরিবহন খাত জ্বালানির বড় ভোক্তা। বিশ্বব্যাপী সড়ক পরিবহন প্রায় ৪৫ শতাংশ তেল ব্যবহার করে। বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে ছোট-মাঝারি দূরত্বের যাতায়াত (৫-১০ কি. মি.) মোটরসাইকেল বা অটোরিকশায় হয়, যা বিপুল জ্বালানি অপচয় করে। তাই আমাদের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের স্বার্থে এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার জন্য তেলের অপচয় রোধ করাটা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে।

এখানেই বাইসাইকেলের প্রাসঙ্গিকতা। একটি সাধারণ বাইসাইকেল কোনো জ্বালানি খায় না। শুধু মানুষের শক্তিতে চলে। যদি ঢাকা বা অন্যান্য শহরের ২০-৩০ শতাংশ ছোট যাত্রা বাইসাইকেলে হয়, তাহলে জ্বালানি সাশ্রয় হবে লক্ষণীয়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাইসাইকেল ব্যবহারে একজন ব্যক্তি বছরে কয়েকশ লিটার তেল বাঁচাতে পারেন। একটি গাড়ি প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১৫০-২০০ গ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড (ঈঙ₂) নিঃসরণ করে, যেখানে বাইসাইকেল শূন্য। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন একবার গাড়ির পরিবর্তে বাইসাইকেল ব্যবহার করলে ব্যক্তিগত কার্বন ফুটপ্রিন্ট ৬৭ শতাংশ কমে। বিশ্বব্যাপী যদি স্বল্প দূরত্বের ২০ শতাংশ যাত্রা বাইসাইকেলে হয়, তাহলে কয়েক কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড কমবে।

বাইসাইকেলের ইতিহাস শুরু হয় প্রায় দুই শতাব্দী আগে মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে একটি সাধারণ যান্ত্রিক আবিষ্কার হিসেবে, যা ধীরে ধীরে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয়, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ১৮১৭ সালে জার্মান ব্যারন কার্ল ভন ড্রাইস প্রথম বাস্তবিক ‘লাউফমাসচিন’ বা ড্রাইসিন আবিষ্কার করেন, যা দুটি চাকা, একটি ফ্রেম এবং স্টিয়ারিং ব্যবস্থা সম্বলিত ছিল কিন্তু প্যাডেলবিহীন; চালক পায়ের সাহায্যে মাটি ঠেলে চালাতেন এবং এটি ছিল আধুনিক বাইসাইকেলের প্রথম পূর্বসূরি। ১৮৮৫ সালে জন কেম্প স্টারলেয় ‘রোভার সেফটি বাইসাইকেল’ উদ্ভাবন করেন, যাতে দুটি চাকাই সমান আকারের, চেইন ড্রাইভ এবং গিয়ার ব্যবস্থা যুক্ত হয়, যা আধুনিক বাইসাইকেলের ভিত্তি স্থাপন করে এবং নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে। ১৮৮৮ সালে স্কটিশ চিকিৎসক জন বয়েড ডানলপ নিউম্যাটিক বা বাতাসভর্তি টায়ার আবিষ্কার করেন, যা যাত্রাকে আরামদায়ক করে এবং কম্পন কমায়। বিংশ শতাব্দীতে বাইসাইকেল শিল্প দ্রুত বিকশিত হয়; ১৯০০-এর দশকে মহিলাদের জন্য বিশেষ ড্রেস-গার্ড সহ ড্রপ-ফ্রেম বাইসাইকেল তৈরি হয়, যা নারী স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বাইসাইকেল সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত হয় দ্রুত চলাচলের জন্য। ১৯৫০-৬০-এর দশকে ইউরোপ ও আমেরিকায় রেসিং বাইসাইকেল এবং মাউন্টেন বাইকের উন্নয়ন ঘটে, যেখানে অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম, ডিস্ক ব্রেক, মাল্টি-গিয়ার সিস্টেম এবং সাসপেনশন যুক্ত হয়। ১৯৭০-এর পর থেকে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শহরাঞ্চলে সাইকেল লেন তৈরি হয় এবং ইলেকট্রিক বাইসাইকেল (ই-বাইক) জনপ্রিয় হয়, যাতে ব্যাটারি ও মোটর সাহায্যে চলাচল সহজ হয়।

ঢাকার বায়ু দূষণ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। মোটরযানের ধোঁয়া এর প্রধান কারণ। বাইসাইকেল প্রচার করলে শুধু জ্বালানি নয়, বায়ুমানও উন্নত হবে। এছাড়া ট্রাফিক জ্যাম কমলে সময় বাঁচবে, অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়বে। ঢাকায় দৈনিক যাতায়াতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট হয় সাইকেল এটি কমাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ডেনমার্কের কোপেনহেগেনের কথাই ধরুন সেখানকার ৬২ শতাংশ মানুষ সাইকেল ব্যবহার করে, যা এটিকে অন্যতম সবুজতম শহর হিসেবে গড়ে তুলেছে। বোগোটায় ‘সাইক্লোভিয়া’ কর্মসূচিতে রবিবার সড়ক বাইকারদের জন্য খুলে দেয়া হয়, যা লাখো মানুষকে উৎসাহিত করে। জাপানের শহুরে পরিকল্পনা সাইকেল-বান্ধব। ঘন জনবসতি ও ছোট দূরত্বের কারণে স্কুল, দোকান বা অফিসে সাইকেলে যাওয়া সুবিধাজনক। ট্রেন নেটওয়ার্কের সাথে সমন্বয় করে লোকজন ট্রেন স্টেশন পর্যন্ত সাইকেলে যান। এতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমে, জ্বালানী খরচ হ্রাস পায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাইকেল ব্যবহারে ছোট ট্রিপে নির্গমন ৭৫% পর্যন্ত কমতে পারে। জাপানে বাইসাইকেল শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জ্বালানী সাশ্রয়ের শক্তিশালী হাতিয়ার। ঘনবসতিপূর্ণ শহর, দক্ষ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং বাস্তববাদী সংস্কৃতির কারণে জাপানে সাইকেল ব্যবহার জ্বালানী সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের সময় জাপানে বাইসাইকেলের জনপ্রিয়তা বেড়েছিল। তেল আমদানির উপর নির্ভরশীল জাপান অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে জ্বালানী-সাশ্রয়ী পরিবহনকে উৎসাহিত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালেও বাইসাইকেল পুনর্গঠনে সাহায্য করেছিল। বর্তমানে জাপানে জাতীয় গড়ে সাইকেলের মোডাল শেয়ার প্রায় ১২-১৫% যা টোকিওতে ১৪% এবং ওসাকায় ২৫% পর্যন্ত। এটি ইউরোপের অনেক দেশের চেয়ে বেশি। শর্ট ট্রিপ (৪ কিলোমিটারের মধ্যে) এবং ট্রেন স্টেশনের সাথে যোগাযোগের জন্য সাইকেল ব্যবহার হয়। অনেক জাপানি গাড়ি মালিকানা এড়িয়ে চলেন এবং দৈনন্দিন কাজে মামাচারি (মাদার্স বাইক) ব্যবহার করেন। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ বাড়ছে। বাইসাইকেল ব্যবহার করে মানুষ সুস্থ থাকবে, হাসপাতালের চাপ কমবে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাইক কমিউটারদের আয়ু বেশি। ঝুঁকি (দুর্ঘটনা বা দূষণ) থাকলেও উপকারিতা অনেক বেশি প্রায় ৯ গুণ। একটি মোটরসাইকেলের জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষন ও অন্যান্য খরচ বছরে হাজার হাজার টাকা। বাইসাইকেলের খরচ অনেক কমশুধু টায়ার ও চেইন মেরামত। বাংলাদেশে বাইসাইকেল শিল্প ইতোমধ্যে রপ্তানিমুখী। সরকারি প্রণোদনায় আরও বড় হতে পারে। বাইক লেন, পার্কিং, শেয়ারিং সিস্টেম তৈরি করলে কর্মসংস্থান বাড়বে। প্রতি মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে বাইক অবকাঠামোয় ১১-১৪টি চাকরি হয় যা হাইওয়ের চেয়ে বেশি।

আজকের একটি প্যাডেল কালকের সবুজ ভবিষ্যৎ তৈরি করবে। ঢাকার মতো শহরে ছোট দূরত্বে সাইকেল উৎসাহিত করলে জ্বালানী আমদানি কমবে, যানজট হ্রাস পাবে এবং স্বাস্থ্য ভালো হবে। দূরের যাত্রায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাইকেল লেন নির্মাণ, পার্কিং সুবিধা এবং সচেতনতা বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য জাপানের মডেল অনুসরণযোগ্য। জাপান দেখিয়েছে, প্রযুক্তি ও নীতির পাশাপাশি সাধারণ বাইসাইকেলও জ্বালানী সংকটের সমাধান দিতে পারে। জাপানের বাইসাইকেল সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে টেকসই পরিবহন সম্ভব। জ্বালানী সংকটের যুগে এটি শুধু পরিবহন নয়, জীবনধারার অংশ হয়ে উঠেছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে শুরু করে সরকারি নীতি সবাই মিলে বাইসাইকেল-বান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।

লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, খুলনা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন