শুক্রবার । ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২

আমরা চাই সুশাসন, দিতে পারবে নতুন সরকার?

পলাশ রহমান

বহু বছর পর এবার বাংলাদেশে এসে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেলাম। প্রবাসে থাকার কারণে দীর্ঘদিন জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিতে পারিনি। এ বছর প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা থাকলেও আমি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম- ভোটের সময় দেশে থাকব এবং সরাসরি কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবো।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে খুলনা শহরের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। বেশিরভাগ জায়গায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চোখে পড়ে। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা বা উত্তেজনা দেখা যায়নি। বরং পুরো পরিবেশ জুড়ে ছিলো উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা নিজ নিজ প্রতীকের ক্যাম্প করে ভোটারদের সহযোগিতা করছিলেন। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখার সমর্থকরা পাশাপাশি অবস্থান করছিলেন। তাদের আচরণ ছিলো সহনশীল। তারা গল্পগুজব করছিলেন, চা খাচ্ছিলেন, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে সহায়তা করছিলেন, কিন্তু উস্কানিমূলক আচরণ বা সংঘাতের কোনো চিত্র চোখে পড়েনি।

ভোট দিতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিলো স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আগ্রহ। অনেককে বলতে শুনেছি, ‘এডাই তো আমাইগে চিরচিনা ভোটের চিহারা’। দীর্ঘদিন পর এমন পরিবেশে ভোট দিতে পেরে মানুষের মুখে ছিলো সন্তুষ্টির হাসি। নারী-পুরুষ, তরুণ-প্রবীণ-সব শ্রেণির মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে অনেকগুলো ভোটকেন্দ্রে একই সাথে কয়েক ফ্লোরে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে। এতে ভোটারদের সিঁড়ি ভেঙে ওঠানামা করতে হয়েছে। নারী এবং বয়স্ক ভোটারদের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়েছে।

এবার জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি আলাদা ব্যালটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখার সময় গণভোট নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা চোখে পড়েনি। মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো জাতীয় নির্বাচন এবং সম্ভাব্য ফলাফল। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বেশ জোরালো। কেউ কাউকে হালকা ভাবে নেয়নি।

বিএনপির এক নেতা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, তারা ১৭০ থেকে ১৮০টি আসনে জয়ের আশা করছেন। জামাতের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে না চাইলেও হাতপাখার নেতাকর্মীরা অর্ধশত আসনের ব্যাপারে আশাবাদী।

ভোটের দিন সরকারি ছুটি থাকায় রাস্তাঘাট ছিলো তুলনামূলক ফাঁকা। গাড়িঘোড়া ও বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ ছিলো, কিন্তু ভোটারদের কেন্দ্রে যাতায়াতে কোনো ভোগান্তি হয়নি। বিভিন্ন মার্কার পক্ষ থেকে ভোটারদের জন্য রিক্সা, ভ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। পুরো শহর জুড়ে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত, শান্ত পরিবেশ বজায় ছিলো।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভোট দিতে ভালোবাসে। তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু গত ১৭ বছর ধরে মানুষ এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলো। পরপর তিনটি জাতীয় এবং অনেকগুলো স্থানীয় নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। ফলে এবারের নির্বাচন ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ছিলো অনেক বেশি। তারা চেয়েছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।

আমরা প্রত্যাশা করি, দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে। মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করবে, ভোট দেবে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে। ফ্যাসিবাদের কোনো দুঃসময় যেনো আর ফিরে না আসে। যারা নতুন করে সরকার গঠন করবেন, তাদের প্রতি অগ্রিম অভিনন্দন। দেশের মানুষের প্রত্যাশা-তারা দেশকে ভালোবাসবেন, জনগণের অধিকার রক্ষা করবেন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। আমরা চাই একটি নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশ-যেখানে সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা সমুন্নত থাকবে।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন