শুক্রবার । ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২

নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় জাতি

আবদুল কাদের খান

পাহাড় থেকে সমতল ভূমি। বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইল জনপদে উত্তাপ ছড়াচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১৯৭০ সালে অবিভক্ত পাকিস্তান আমলে ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মতো এই নির্বাচনও আশা করা হচ্ছে আনন্দ উচ্ছ্বাসে ভরাট থাকবে। সমগ্র জাতি তাকিয়ে আছে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিকে। দেশের সকল স্তরের নর-নারী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পরমত সহিষ্ণুতা, সুন্দর আচরণ বিধি এবং নির্বাচন কমিশনের আরও দায়িত্বশীল আচরণ দাবি করেছে। বালখিল্য সুলভ ভাবে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে ধরনের শব্দ প্রয়োগ করেছেন, আগামীতে তার পুনরাবৃত্তি জাতি ও জনগণ আর দেখতে চায়না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনি তপশিল ঘোষণার একদিনের মাথায় ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান সমন্বয়ক শরিফ ওসমান হাদী হত্যার ঘটনাকে ন্যক্কারজনক ভাবে যা বলেছেন, তা সত্যিই নিন্দনীয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাচ্ছিল্যের সাথে ঘাতকের হাতে শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুকে যদি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করেন, তাহলে উনার কাছে নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করাটাই বাতুলতা মাত্র। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে উনি কার স্বার্থ রক্ষার নির্বাচন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন?

বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে অনেকে ব্যঙ্গ করে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বলে। এর মূলে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সচেতন প্রবণতা। নির্বাচনের আর মাত্র দু’দিন বাকি। এর মধ্যে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পর্যবেক্ষক মহলের মতে, নির্বাচন কেন্দ্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও কঠোর করা, যাতে নির্বাচন কেন্দ্রে কোন মহলের উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা মাথা চাড়া দিয়ে না উঠতে পারে।

নির্বাচন কমিশনকে ইতোমধ্যে বিতর্কিত করার জন্য কোনো কোনো স্থানে অতি উৎসাহী হয়ে হাসিনার আমলের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দু’চারজন সদস্য উসকানিমূলক কথা বলছে, স্বেচ্ছাচারমূলক আচরণও করছে! বিষয়টি নিশ্চয়ই নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায়নি। ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান সমন্বয়ক শরীফ ওসমান হাদীর রক্ত শুকাতে না শুকাতেই আবারও রাজপথে রক্ত ঝরছে। এসবকে কি কোনোভাবে ভালো আলামত বলা যায়? স্মরণ করা যেতে পারে, ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান সমন্বয়ক, যিনি ঢাকা ৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন, ঘাতকের হাতে তাঁর মৃত্যু যখন দেশের ফ্যাসিবাদ বিরোধী মানুষের কলিজা ছিঁড়ে দিয়েছে, সেখানে হাসিনার আমলের ঘাপটি মেরে থাকা এক শ্রেণির পুলিশ সদস্যের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বাংলাদেশের গোটা গণমানসকে দারুণ ভাবে আহত করেছে।

শরিফ ওসমান হাদী ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় আশঙ্কা করে বলেছিলেন, আমার মৃত্যুর পর বা আমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে অন্তত ঘাতকের যেন বিচার হয়। দুঃখজনক ভাবে জাতি লক্ষ্য করছে, হাদী হত্যার বিচার কার্যকে নানাভাবে চাপা দেওয়া হচ্ছে। গোটা জাতিকে যদি কোনোভাবে বোকা বানানোর কোনো জঘন্য চেষ্টা করা হয়, সম্ভবত তা হবে বিপ্লবের তপ্ত আগুনে স্বেচ্ছাচারিতার কয়েক ফোঁটা ঘি ঢালা। যে কথা বলছিলাম। গোটা জাতির সাধারণ নাগরিকরা দল বে দলের ডামাডোলে নির্বাচনি প্রচারণার সময় সম্পূর্ণ বোবা হয়ে রয়েছে।

তারা চাইছে ২০২৪-এ জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের লেলিয়ে দেওয়া মানুষরূপী বেশকিছু পশুর হাতে ১৪ শ’ এর মতো তাজা প্রাণ রক্তাক্ত শহীদ হয়েছে। তার বদলা নেবে এবারের ঐতিহাসিক ব্যতিক্রমী নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে রায় দিয়ে। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে যেসব সংসারের বীর বিপ্লবী সন্তানেরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে, আর ঘরে ফেরেনি, অকাতরে জীবন দিয়েছে, তাদের নিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসররা বলেছিল, এরা জঙ্গি, সন্ত্রাসী। এরা বিদেশের মদদপুষ্ট। তারই উত্তম জবাব হবে, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার, গণ ব্যালটের নীরব রায়ের মাধ্যমে একটি সফল বিপ্লবাত্মক নির্বাচন।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত, পাহাড় থেকে সমতল ভূমিতে প্রত্যেকেই চায় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় আর যেন কোনো ফ্যালানিকে ঝুলতে না হয়। বাংলাদেশের মানুষ হাসিনাকে দীর্ঘ ১৫ বছর পর দলবল নিয়ে পালাতে বাধ্য করেছে, পুনরায় আর এই ফ্যাসিস্ট বা এরই মতো ছদ্মবেশী আর কোনো লুটেরা যাতে বাংলাদেশের ক্ষমতার আসনে বসতে না পারে। বাংলাদেশের মানুষ ২০০৮ সালের ভারতীয় কৌশলের নির্বাচন দেখেছে। তারপর ধারাবাহিকভাবে ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এর তৎকালীন শাসকদের তামাশার নির্বাচন দেখে হয়রান হয়েছে। সেই সময় জাপানের রাষ্ট্রদূত স্পষ্টই নির্বাচনের নামে রাতে তামাশার কথা অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে মন্তব্য করেছেন।

অনেক রক্ত। অনেক ত্যাগের পর বাংলাদেশের জমিনে দীর্ঘ দেড় যুগ পর আবার নির্বাচনের তোড়জোড় হয়েছে, এখন কাক্সিক্ষত দিনের মাত্র আর ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা। বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে এইটুকু জানাতে চায় যে, অতীতে নির্বাচন কমিশন গুলোর মতো আচরণ যেন না করা হয়। তাহলে এই জাতির সহিষ্ণুতার লাগাম ছিঁড়ে যেতে পারে। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে, নির্বাচন কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার সক্রিয়তা বজায় রাখা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি এবং পর্যবেক্ষক টিমকে নির্বাচন কেমন হচ্ছে, তা’ পর্যবেক্ষণে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা।

প্রত্যেক নির্বাচন কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকা। যেকোনো মুহূর্তে পলাতক ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের সমর্থন পুষ্ট এক শ্রেণীর ইতর চক্র নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারে। তাই সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত সবাইকে।

একটি বিষয় নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে। শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। শেষ যাতে ভালো হয়, তার জন্য আবেগ বা পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল বা মতকে কোনোভাবে প্রাধান্য দেওয়া উচিত হবে না। ইতোমধ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দলের মধ্য থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র সম্পর্কে যে সমস্ত প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তার কী কোনো সুরাহা করেছে, চলতি নির্বাচন কমিশন? তা কিন্তু আমরা কোনোভাবে জানতে পারিনি!

আমরা শুনতে পাচ্ছি, বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দল উত্তাপ ছড়াচ্ছে, অমুক অমুক এলাকায় অমুক দলের লোক প্রচার প্রচারণায় যেতে পারবে না কোনোমতে। এ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, এ পর্যন্ত আমরা একটুও জানতে পারি নাই। সমাজে দেশে ভোটকেন্দ্রে উৎসবমুখর পরিবেশে শান্তিপূর্ণ অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে এমনটাই গোটা জাতি আশা করে। নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি। এই মুহূর্তে ষড়যন্ত্রকারীরা কখনো জ্বালাও পোড়াও, কখনো ছোটখাটো দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টা করবে। পরিস্থিতি যাতে অস্থির না হয়, এ ব্যাপারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সুস্থ মাথায় সকল জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।

এ নির্বাচন কী ফলাফল বয়ে আনবে আমরা এখন আগাম মন্তব্য করতে চাই না। তবে বলবো, ন্যায়- ইনসাফ এর বাংলাদেশ দেখতে চাইলে, এই মুহূর্তে আমাদের যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব হবে সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক উদার ব্যক্তি বা প্রার্থীকে ভোট দেওয়া। এর জন্য কেউ ভোট কিনতে আসলে বা দুর্নীতির জন্য ইশারা দিলে, অবশ্যই নাইন নাইন নাইন এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। ৩ কোটি তরুণদের ভোট এবং এক কোটি সাধারণ মানুষের ভোট বিজয়ের বন্দরে তাদেরকেই নিয়ে যাবে, যারা বিপন্ন মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে পারবে। আমাদের প্রত্যাশা ভালোয় ভালোয় প্রার্থিত দিনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। জাতি নতুন একটি পার্লামেন্ট পাক। নতুন ভাবে গণরায়ের নতুন সূর্যোদয় হোক।

[লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।]

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন