ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর মাত্র সপ্তাহ দুয়েক পর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের দেড় দশকের দুঃশাসন, নির্বাচনের নামে দীর্ঘ সময় ধরে তৎকালীন শাসক গোষ্ঠীর আমি ডামি নামক ভুয়া নির্বাচন সবকিছুর অভিজ্ঞতা এদেশের জনগণের অন্তরে প্রজ¦লিত। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনে ২০২৪ এর জুলাইয়ে সর্বস্তরের নাগরিকদের অংশগ্রহণ, ছাত্র জনতার আপসহীন লড়াই হাসিনাকে সাধের ক্ষমতার আসন ছেড়ে পৈতৃক জীবন নিয়ে পালাতে বাধ্য করেছে।
জনগণের প্রত্যাশা ছিল, ২০০৮ থেকে ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই বিপ্লবে স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পর দেশটির সংস্কার হবে। প্রত্যাশা ছিল আইন বিচার বিভাগের সংস্কার হবে। শিক্ষা বিভাগের কারিকুলাম সহ সব ধরনের সংস্কার হবে। স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক সংস্কার হবে। জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সংস্কার হবে। মোদ্দা কথা, দুঃশাসনের যুগে যেখানে যেখানে অনাচার হয়েছে, তার শেকড় উপড়ে ফেলা হবে, ব্যাপক সংস্কার করা হবে। দেশের আপামর মানুষ এটাই দাবি করেছিল! কিন্তু হা হতোস্মি! ৫ আগস্ট হাসিনা পলায়নের পর ৮ আগস্ট ২০২৪ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার-এর প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসের ক্ষমতা গ্রহণের পর মানুষ যথেষ্ট আশায় বুক বেঁধেছিল, আশ্বস্ত হয়েছিল। তারপর?
তারপরের ইতিহাস বড়ই হতাশার এক ডক্টর প্রফেসর ইউনুস ছাড়া তাঁর পাশে অনেকেই নেই। হাসিনা সরকারের সময়কার কুখ্যাত মন্ত্রী নামধারী গণ দুশমনরা ক্যান্টনমেন্টে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে গোপনে আশ্রয় গ্রহণ করে। ম্যাজিক বিদ্যার মতো আশ্চর্যজনকভাবে, ৬২২ জন কীভাবে পালিয়ে গেল কেউ তার জবাব দিতে পারছে না। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল, তারা কী ভাবে রাজপুত্রের মতো বীরদর্পে পালিয়ে গেল? কারা এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহী কাজে সহযোগিতা করলো? একটি জাতি যখন বিপ্লবের মাধ্যমে একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটালো, তাদের নিশ্চয়ই কিছু স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা ছিল? এই স্বপ্নের বিনাশ কারা ঘটালো? সে প্রশ্নটি এখন সমগ্র জাতির সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। ইতিহাসের এই গাদ্দার গুলো কারা? যে বিপ্লব সফলতার মুখ দেখে আবার মুখ থুবড়ে পড়লো। এর পেছনে কারা কুখ্যাত কুশীলব ছিল? সরকারের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা একটি মীরজাফর চক্রের জন্য একটি সফল বিপ্লব Un finished revolution অর্থাৎ অসমাপ্ত বিপ্লব জাতিকে পরখ করতে হলো।
প্রশ্ন উঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পিলখানা হত্যাকাণ্ডের গত ১৬ মাসে কেন কোনো সুরাহা করতে পারে নাই? গত ১৫-১৬ বছরে নিখোঁজ, গুম হওয়া অসংখ্য পরিবারকে সম্মানজনক কোনো সান্ত্বনা কি দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো পজিটিভ ইনফরমেশন কি আছে? কেন নাই? শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ড যারা চালিয়েছিল, যাদের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড বা ম্যাসাকার হয় তার কি কোনো দৃশ্যমান সাদাকালো চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি? কেন পেলাম না? ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার নির্দেশে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৮ টি বিভাগীয় শহরে যারা আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর ওই কুখ্যাত সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য বেপরোয়া জীবন ঘাতি বুলেট ছুড়িয়ে ছিল, তাদেরকে কী বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে? না হওয়ার কারণ কী? সরকারের সচিবালয়ে নাশকতা সৃষ্টি করে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো, যাতে দুর্নীতির খতিয়ান রয়েছে, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর সাথে জড়িত কেষ্টবিষ্টুরা এসব সন্দেহভাজন তস্কররা, এই পোড়ানো ঘটনার সাথে জড়িত, তাদের বাস্তব চেহারা কি আজও জাতির সামনে দেখানো হয়েছে? জুলাই বিপ্লবের অনেক আগে থেকে প্রবাসী অ্যাক্টিভিস্ট বহুমাত্রিক চিন্তার অধিকারী পিনাকী ভট্টাচার্য, অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন, ডক্টর কনক সরোয়ার, ডক্টর তাজ হাশমি, আমেরিকা প্রবাসী আইন বিশেষজ্ঞ জ্যাকব মিল্টন স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ২০০ জন উচ্চ পর্যায়ের হাসিনা সরকারের পুলিশ অফিসার নামধারী খুনি দেশত্যাগের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। বিপ্লবের আগে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এসব কুখ্যাত নরপিশাচদের নিরাপদে দেশত্যাগে কারা কীভাবে সহযোগিতা করেছে জাতি আজ তা স্পষ্টভাবে জানতে চায়।
এতসব ব্যর্থতার পর যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালে হাসিনা সহ তার সরকারের কুখ্যাত জালেমদের বিচার শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই বিশেষ মতলবে দেশের কয়েকটি দল প্রবল জনমত উপেক্ষা করে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন দাবি করে বসলো! হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে তো কোনো নির্বাচন দাবি করতে পারে নাই! হাসিনার অবৈধ সরকার তো ২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কথা, অথচ বিপ্লব পরবর্তী নড়বড়ে অর্থনীতিতে যখন প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে, তখনই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি প্রধান হয়ে দেখা দিল! ডক্টর প্রফেসর মোঃ ইউনুস যখন ধ্বংসের স্তূপ থেকে দেশটাকে টেনে তুলছেন, তখনই বলা হলো ডিসেম্বর ২০২৫ এর মধ্যে নির্বাচন না দিলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থতার দায়ে চলে যেতে হবে। উচিত শিক্ষা দেওয়া হবে বলেও শাসানো হলো। এরপর থেকে সবকিছুই ঢিমেতেতালভাবে চলছে। বাধ্য হয়ে হয়ে সরকার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ঘোষণা করলেন। এখন দেশের সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে। মনোনয়নপত্র জমা, বাছাই এবং সর্বশেষ প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্নের পর গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ বৃহস্পতিবার থেকে সব দলের প্রচারণা চলছে। কিন্তু জনগণের মনে একটি প্রশ্ন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কী হলো? সারা দেশব্যাপী একদিনেই নির্বাচনে প্রত্যেক নির্বাচনী কেন্দ্রে কী সিসি ক্যামেরা থাকবে? পেশি শক্তি, হুমকি ধামকি পার্টি, হোন্ডা গুন্ডা এরা কী নির্বাচন কেন্দ্রের মধ্যে বা ৪০০ গজের মধ্যে অবাধে পাঁয়তারা করে বেড়াবে? এই মুহূর্তে নিরীহ মানুষরা জানতে চায়, এদেরকে প্রতিরোধের ব্যাপারে কী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? সরকার কি এর কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছে? পুরোনো নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে জনগণের আশা ভরসা খুবই কম! কারণ এরা সবাই কলের গানের সামনে বসে থাকা কুত্তাটির মতো ‘His Masters voice’ (যা গাওয়ানো হবে তাই গাইবে বলে) জনগণের মনে হয়েছে! এরা সবাই নির্বাচন কমিশনে নিযুক্ত মেরুদণ্ডহীন প্রাণী বলে ইতোমধ্যে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। এদের অবস্থা হয়েছে ইশারায় পরিচালিত হওয়া অর্থাৎ ‘যেমনি নাচাও তেমনি নাচি পুতুলের কী দোষ?’ পুতুল নির্বাচন কমিশন যে নির্বাচনী ফলাফল দেবে তাকি একটি গোঁজামিল ফলাফল হবে? জনমনে এটাই এখন একটি জ¦লন্ত জিজ্ঞাসা। অনেকে বলতে পারেন এমন জিজ্ঞাসার হেতু কী? অবশ্যই হেতু আছে।
কথায় বলে না, — ‘The morning shows the day’ সকাল দেখেই যেমন বোঝা যায়, সারাটা দিন কেমন যাবে, নির্বাচন কমিশনের মনোনয়নপত্র জমা এবং বাছাই এর ছ্যারা-ব্যারা লেজ গোবরে অবস্থা দেখে জনগণ তা সহজেই অনুমান করতে পেরেছে। এই নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে জনমনে ব্যাপক অনাস্থা ও সন্দেহ পুঞ্জীভূত হয়েছে। কারণ কী? কারণ তো প্রকাশ্য দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। নমিনেশন পেপার বা মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর প্রার্থীর আয় উপার্জন, তার যোগ্যতা, কোথায় কোথায় নাগরিকত্ব আছে, ঋণ খেলাপি কিনা এসব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা দরকার। নির্বাচন কমিশন এই কাজগুলো কি সঠিকভাবে করেছে? তাহলে ডাল মে কুচ কালা রয়ে গেল কেন? পুরো জাতির চোখে ধুলো দিয়ে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তি ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব অর্থাৎ দেশি ও বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের কাছে জায়েজ বলে গণ্য হয়েছে। সেলুকাস কী বিচিত্র এ দেশ! বাল উঠে নাই এমন শিশু এই ধরনের চিত্র দেখে বলে দিতে পারে, কে মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্য আর কার মনোনয়নপত্র বাতিল হবে! অথচ আমাদের দামড়া নির্বাচন কমিশন সবকিছুই জায়েজ করে দিয়েছে কার ইঙ্গিতে? জনগণ জানতে চায়, কোন তালিকা কোন মাপকাঠি অনুযায়ী এগুলো সঠিক হলো? এটা কী একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কাজ? সমগ্র জাতি জনগণ এই প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে উপযুক্ত জবাবের জন্য রেখে দিল!
প্রশ্ন উঠেছে, এই নির্বাচন কমিশন কী কারো ইশারায় চলছে? তা না হলে এই সামান্য বিষয়টি নির্বাচন কমিশন বুঝতে অপারগ কেন? শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে, নির্বাচনের লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড রক্ষা হচ্ছে না! কোথায় সেই লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড? কোনো কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল গান বাজনা, ঢাক ঢোল শোহরত সহকারে জন সমাবেশে ১০-১৫টা মাইক ব্যবহার করছে, আবার বিশেষ মহলের ইঙ্গিতে কারো কারো উঠান বৈঠকে হ্যান্ড মাইক কার্যক্রমে হানা দিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে, নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে। এইসব উসকানি পাচ্ছে কোথায়? এখানে নির্বাচন কমিশন কেন কুম্ভ ঘুমে? বিষয়টি কী নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ারে পড়ে না? নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা কাল থেকে প্রজাতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কর্মচারীর চাকুরি নির্বাচন কমিশনে দায়বদ্ধ। তাহলে কেন এখানে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে এত প্রশ্ন উঠবে? নির্বাচন কমিশনকে আমরা আবারও একটি কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। আল্লাহর ওয়াস্তে একটু সতর্ক হোন। এই মুহূর্তে সামনের এই দুই সপ্তাহ সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপরে কঠোর নজরদারি করুন। প্রতিদ্বন্দ্বী দল গুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ প্রচার প্রচারণায় যাতে কোন ষড়যন্ত্রকারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, তার জন্য সার্বক্ষণিক মনিটরিং দরকার। সীমান্তের ওপারে বসে পতিত স্বৈর শাসকের পলাতক দোসররা রীতিমতো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর মতলব এঁটে চলেছে। কথাগুলো নির্বাচন কমিশন এখন থেকে হৃদয়ঙ্গম করলে বোধ করি ভালো হবে। সর্বশেষে আবারও বলি, নির্বাচন যাতে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সে ব্যাপারে আরও তৎপরতা জোরদার করা দরকার। বিষয়টি যাতে লেজে গোবরে জড়িয়ে না যায়, সে ব্যাপারে আগাম সংকেত দিয়ে রাখলাম।
আমাদের দেশে একটি চলতি প্রবাদ আছে, ‘গরিবের কথা বাসি হলে কাজে ফলে!’ তাই নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংশ্লিষ্ট মেশিনারিজকে আরও সক্রিয় হওয়ার জন্য বলবো, মনে রাখবেন, ‘Signal is sufficient for wiser.’ অর্থাৎ জ্ঞানীর জন্য সংকেত উচ্চারণই যথেষ্ট। আমরা একটি কথা তো জানি, ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’। আজ জাতি চরম সংকট সন্ধিক্ষণে। এই মুহূর্তে কেউবা কারো সামান্য গাফিলতি জাতির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, কথাগুলো মনে রাখবেন। বক্তব্যে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে নিজ নিজ গুনে ক্ষমা করবেন! ধন্যবাদ।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম



