সংসদ নির্বাচন এলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি শুনলে মনে হয় জাতীয় সংসদের নয়, বরং ইউনিয়ন কিংবা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন চলছে। রাস্তা, কালভার্ট, খেয়াঘাট, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল সবকিছুই তারা বানিয়ে দেবেন বলে ঘোষণা দেন। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতির তালিকা যত দীর্ঘ হয়, ততই প্রশ্ন জাগে তাহলে জাতীয় সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক দায়িত্ব কী?
বাংলাদেশের সংবিধান এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ক্ষমতা হলো ‘রাষ্ট্রের জন্য আইন প্রণয়ন করা।’ অর্থাৎ এমপি’র প্রধান পরিচয় আইনপ্রণেতা। একই সঙ্গে ৫৫(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা তাদের সকল কর্মকাণ্ডের জন্য জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। এর অর্থ সংসদ সরকারের ওপর নজরদারি করবে, প্রশ্ন তুলবে, সমালোচনা করবে এবং প্রয়োজনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
কিন্তু বাস্তবে এই সাংবিধানিক কাঠামো কার্যত উপেক্ষিত। এমপিরা যখন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন, তখন তারা শুধু জনপ্রিয়তার রাজনীতি করেন না; তারা নিজেদের সাংবিধানিক সীমারেখা অতিক্রম করেন। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ রাস্তা, স্কুল বা স্থানীয় অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার এমপির নয়।
এমপিরা যখন এই দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেন, তখন দুটি সাংবিধানিক ক্ষতি ঘটে। প্রথমত, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিকেন্দ্রীকরণের মূল চেতনা ধ্বংস হয়। দ্বিতীয়ত, সংসদ তার মূল ভূমিকা আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জায়গা থেকে সরে আসে। সংসদ তখন আর সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রকৃত প্রতিফলন থাকে না।
আরও উদ্বেগজনক হলো, সংসদ সদস্যদের এই আচরণে সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে ঘোষিত গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের নীতিও দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ যখন সংসদ সরকারকে প্রশ্ন করে না, তখন নির্বাহী ক্ষমতা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। সংসদে নীতিগত বিতর্কের বদলে উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাব কষা শুরু হয় কে কত রাস্তা আনলেন, কে কত বরাদ্দ পেলেন।
এই বাস্তবতায় ভোটারদের ভূমিকার কথাও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ভোটারদের এমনভাবে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে যেন এমপি মানেই উন্নয়ন ঠিকাদার। ফলে তারা প্রশ্ন করেন না এই এমপি সংসদে গিয়ে কোনো আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখবেন, কোনো নীতির বিরোধিতা করবেন, কীভাবে সরকারের ভুলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন।
সংবিধান খুব স্পষ্টভাবে দায়িত্ব বণ্টন করে দিয়েছে। উন্নয়ন বাস্তবায়ন স্থানীয় সরকারের কাজ, আর আইন প্রণয়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জাতীয় সংসদের কাজ। এই সীমারেখা ভেঙে জনপ্রিয়তার রাজনীতি চলতে থাকলে সংসদ দুর্বল হবে, স্থানীয় সরকার দুর্বল হবে আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সংবিধান নিজেই।
প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত সরল আমরা কি জাতীয় সংসদকে সংবিধান অনুযায়ী কাজ করতে দেব, নাকি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির আড়ালে সংবিধানকে বারবার অবজ্ঞা করতেই থাকব?
খুলনা গেজেট/এনএম

