মানব ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে একটি অমোঘ সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে-মিথ্যা যত শক্তিশালী হোক, অন্যায় যত সংগঠিত হোক, অবিচার যত দীর্ঘস্থায়ী হোক, শেষ পর্যন্ত সত্যই বিজয়ী হয়। তবে এই বিজয় সবসময় তাৎক্ষণিক হয় না। অনেক সময় সত্যকে পরাজিত মনে হয়, নীরব হতে হয়, অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যেতে হয়। তবুও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-বিলম্বিত হলেও সত্যের জয় হবেই।
সত্যের পথ কখনোই সহজ নয়। যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, তাদের অনেক সময় একা লড়তে হয়, অপবাদ সহ্য করতে হয়, নিপীড়নের শিকার হতে হয়। সমাজের প্রভাবশালী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক শক্তি বা অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে সত্য বারবার চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সত্যের একটি বৈশিষ্ট্য আছে-তা নিজস্ব আলো নিয়ে বেঁচে থাকে। সময়ের আবরণে ঢাকা পড়লেও একদিন না একদিন সেই আলো আবার উদ্ভাসিত হয়।
ইতিহাসের দিকে তাকালেই এর অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। গ্যালিলিওকে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে-এই সত্য উচ্চারণের জন্য শাস্তি পেতে হয়েছিল। বহু বছর পর সেই সত্যই বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ ২৭ বছর কারাগারে বন্দি ছিলেন। তবুও শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়ের পক্ষেই দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস বদলে গেছে। এই উদাহরণগুলো আমাদের শেখায়-সত্যকে সাময়িকভাবে থামানো যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য দমিয়ে রাখা যায় না।
ব্যক্তিগত জীবনেও এই বাস্তবতা সমানভাবে প্রযোজ্য। কর্মক্ষেত্রে বা সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, মিথ্যা প্রচার, চাটুকারিতা বা অন্যায় পথে চলা মানুষ সাময়িক সাফল্য পায়। আর যারা সততা ও ন্যায়ের পথে থাকে, তারা বঞ্চিত হয়, অবহেলিত হয়। এতে অনেকের মনে হতাশা জন্ম নেয়-সত্যের কি আদৌ কোনো মূল্য আছে? কিন্তু সময়ই শেষ পর্যন্ত তার জবাব দেয়। মিথ্যার ভিত্তিতে গড়া সাফল্য টেকে না; কোনো না কোনোভাবে তা ভেঙে পড়ে। আর সত্যের ভিত্তিতে গড়া জীবন, যত ধীরগতিতেই হোক, শেষ পর্যন্ত স্থায়ী সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করে।
সত্যের বিজয় বিলম্বিত হওয়ার অন্যতম কারণ হলো মানুষের দুর্বলতা। আমরা অনেক সময় সুবিধার কাছে নতিস্বীকার করি, ভয়কে প্রাধান্য দিই, নীরব থাকাকে নিরাপদ মনে করি। এতে অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সত্যের পথ আরও দীর্ঘ হয়ে যায়। কিন্তু যত বেশি মানুষ সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, তত দ্রুত সেই বিজয় ত্বরান্বিত হয়। তাই সত্যের জয় শুধু সময়ের অপেক্ষায় থাকা নয়, বরং সচেতন মানুষের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের ওপরও নির্ভর করে।
পরিশেষে বলা যায়, সত্য কখনো মরে না। তা চাপা পড়ে, আহত হয়, অবহেলিত হয়, কিন্তু ধ্বংস হয় না। সময়ের স্রোতে একদিন না একদিন সব মিথ্যার মুখোশ খুলে যায়, সব অন্যায়ের হিসাব মিলে যায়। তাই যত দীর্ঘই হোক পথ, যত গভীরই হোক অন্ধকার-আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে: বিলম্বিত হলেও সত্যের জয় হবেই।
আন্দুলিয়া
২০ জানুয়ারী, ২০২৬।
খুলনা গেজেট/এনএম

