ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় রীতিমতো গরমভাবে কড়া নাড়ছে। ২০২৪ -এর আগস্ট বিপ্লবের পর জাতি জনগণ প্রত্যাশা করেছিল যা’ যা’ কিছু, তার অনেকগুলোই এখনো উপেক্ষিত হলেও নির্বাচনের অঙ্গীকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান, শান্তিতে নোবেলজয়ী, বীর চট্টলার কৃতী সন্তান, বিপ্লবোত্তর বিধ্বস্ত জাতির কাণ্ডারি ড. প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুস ঠিক ঠিকই পালন করেছেন। হাজারো বাধা, নানা চড়াই উতরাই পার হয়ে আগামী ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী উৎসবের আমেজে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। নানা তর্ক-বিতর্ক কাটাকুটি বিশ্লেষণ থাকলেও আমরা এটি ধরে নিয়েছি ইনশাআল্লাহ ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সর্বত্র নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তায় মুখর-সর্বাঙ্গীণ। চায়ের দোকানে জোর আলোচনা চলছে। চায়ের কাপে তুফান তুলে সমর্থক ও বিভিন্ন দল মতের মানুষ মত মতো যুক্তি দেখিয়ে গুছিয়ে গুছিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। মোদ্দা কথা, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সর্বত্র ভোটের আলোচনায় পরিবেশ উত্তপ্ত। গোটা দেশটা মনে হয় ভোট জ¦রে কাঁপছে! এ দেশের প্রতিটি নাগরিক প্রত্যেকের মুখে একই কথা, এবার আমরা সুশৃঙ্খলভাবে, বাধা-বন্ধনহীন, নিরপেক্ষভাবে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে স্ব-স্ব ইচ্ছা অনুযায়ী পছন্দের প্রার্থীকে নিজেদের ভোট অধিকার প্রয়োগ করবো।
সকল প্রকার উদ্বেগ-আশঙ্কা এড়িয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের নিবন্ধিত দল গুলোর মনোনয়নপত্র জমা শেষ হয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়েছে অনেক। জোট রাজনীতি, ভোট রাজনীতিতে, বেশ মজার মজার ঘটনা নিত্যদিনই ঘটেই চলেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে মত ভিন্নতা এবং বিদ্রোহ যেন থামছেই না। সর্বশেষ জানা যায়, ১১৭ টি আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থীরা কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে মনোনয়নপত্র ক্রয় করেছে এবং জমা দিয়েছে। কেন্দ্রকে তারা কোনোভাবেই পাত্তা দিচ্ছে না। বিএনপি’র ১১৭ জন বিদ্রোহী প্রার্থীর এ ধরনের আচরণের হেতু কি? অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ওরাও দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীর মতো যোগ্য, সম্মানের- হেভিওয়েট! বিএনপির ১১৭ টি আসনের এই হেভি ওয়েট বিদ্রোহী প্রার্থীদের সম্পর্কে দলের কেন্দ্রীয় কম্যান্ড সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। শেষ পর্যন্ত ওদের পরিণতি রাজনীতির ক্ষেত্রে যে নেই হয়ে যাবে তাও ওরা ভালোভাবে জানে। তারপরেও বিদ্রোহ, কিন্তু কেন? যতদূর জানা যায়, বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলীয় জেলা ঝিনাইদহের এক বিদ্রোহী প্রার্থীকে কেন্দ্রের অফিসে ডাকা হয়েছিল। বিএনপি’র গুলশান অফিস থেকে তাকে তলব করার পর বলা হয়, তোমার ওই পদে শরিক দলের প্রার্থীকে ছেড়ে দিতে হবে। দলের হাই কমান্ড-এর নির্দেশ মানতে হবে। ওই বিদ্রোহী প্রার্থী নাকি সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবে না। অথচ ২০শে জানুয়ারি ২০২৬ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। বিদ্রোহী ওই প্রার্থীর স্পষ্ট জবাব, গত ১৭-১৮ বছর অর্থাৎ প্রায় দুই যুগ নানা ধরনের মামলা হামলা পলাতক জীবন কাটানোর পর নানা ধরনের জুলুম অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছি, দলত্যাগ করি নাই। দলীয় কর্মীরা দুর্যোগের মধ্যে দিন কাটিয়েছে, শুধু এই সুদিনের আশায়। এখন যদি জোটের শরিক দলের প্রার্থীকে সেই জায়গায় চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের রাজনীতি তো শেষ! আমাদের কর্মী বাহিনীকে, এত ত্যাগ স্বীকারের পর এখন কী বলবো? শরিক দলের প্রার্থী উড়ে এসে, জুড়ে বসে, নির্বাচন করবে, আর আমরা কি বসে বসে আঙুল চুষবো?
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে থোড়াই কেয়ার করে ঝিনাইদহের ওই বিদ্রোহী প্রার্থী এক ধাপ উঁচুতে উঠে বলেছে, প্রয়োজনে আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হোক। আমি এখনই ইস্তফাপত্রে সই করতে চাই। বিষয়টি সত্যিই এদেশের একটি শক্তিশালী বৃহৎ রাজনৈতিক দলের জন্যে খারাপ আলামত। ভীষণ দুঃসংবাদও বটে। শুধু ঝিনাইদহের ওই প্রার্থীর মতো আরও ৪৮ জন প্রার্থী একইভাবে রীতিমতো বিক্ষুব্ধ। তারাও একযোগে প্রয়োজনে দল থেকে পদত্যাগের হুমকিও দিয়েছে। দলের মধ্যে নেতৃত্বের কোন্দল কোনো পর্যায়ে পৌঁছালে এমনটি হতে পারে? একটু ভাববার বিষয়। একে রাজনীতির ভাষায় নেতাদের গণবিদ্রোহ বা মাস মিউটিনি (সধংং সঁঃরহু) বলা যেতে পারে। জনমনে প্রশ্ন, দলের চেয়ারম্যান বা চেয়ারপারসন তারেক রহমান তো এখন দেশে ফিরে এসে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব ও নির্দেশনা দিচ্ছেন, তারপরেও এ ধরনের অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হবার কারণ কী? পর্যবেক্ষক মহলের মতে, দলের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব বা গৃহযুদ্ধের নানাবিধ কারণ রয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কী সেই কারণ?
জানা যায়, খোদ বিএনপি তৃণমূল পর্যায়ে এই দ্বন্দ্ব চলছে। দলীয় মনোনয়ন অর্থাৎ নমিনেশন যে বা যাদের পাওয়ার কথা ছিল, এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, তাদেরকে উপেক্ষা করে বিশেষ বিশেষ চেনা মুখদের নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। যেখানে কর্মীবাহিনী ও নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রখর হয়ে দেখা দিয়েছে। এখন কেন্দ্র থেকে কড়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হলেও তারা কোনো হুঁশিয়ারি মানছেন না। তাদের বর্তমান ভাবনা ‘ডু অর ডাই’ অর্থাৎ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে করবো অথবা মরবো। আজ মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের চুড়ান্ত বা শেষ দিন। দেখা যাচ্ছে, ১১৭ জন বিদ্রোহী প্রার্থী সবার মনোনয়নপত্র টিকে গেছে এবং সবাই স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকা থেকে কেন্দ্র কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে নির্বাচন করার ব্যাপারে দৃঢ় চিত্ত, অনড়।
উপমা হিসেবে অনেকেই বলছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (দুই) আসনে জমায়েতে উলামার কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জুনায়েদ আল হাবিব কে বিএনপি’র শরিক দলের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছে। অথচ সেখানে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক অলি আহাদের একমাত্র কন্যা, অত্যন্ত নন্দিতা রাজনীতিবিদ, রাজনীতির বাঘিনি কন্যা ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তাঁর জন্মস্থান সরাইল আশুগঞ্জ মিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে দীর্ঘদিন বলে আসছেন। অথচ তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। রুমিন ফারহানা বলেছেন, বিএনপি দলের দুর্দিনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন। অথচ দলের সুদিনে তিনি আজ চরমভাবে উপেক্ষিত ও বহিষ্কৃত। উপেক্ষিত তার নির্বাচনী এলাকা।
প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে ১১৭টি আসনে বিদ্রোহ হলে নিজেদের দলের মধ্যে ভোট কাটাকাটি হলে এই আসন গুলোর পরিণাম কি দাঁড়াবে? এভাবে দলের বিদ্রোহ ঠেকানো না গেলে, ভোট কাটিং সুইসাইড চললে বিএনপি নামক দলের নির্বাচনের ভবিষ্যৎ দারুণ অন্ধকার!
উপসংহার : সম্প্রতি ময়মনসিংহে ধানের শীষ প্রতীকের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নির্বাচনের পূর্বে এখন যদি এ অবস্থা চলে, তাহলে নির্বাচনের পর ওই দলটির মধ্যে গৃহ বিবাদ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।
এ মুহূর্তে জামায়াত ও শরিক দল তাদের উঠান বৈঠক ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। জনগণের প্রশ্ন, এই গৃহযুদ্ধের মধ্যে মনীষী বাক্য মনে রেখে, জামাত এগোচ্ছে ক্রমশ। তাদের ভাবনা, বিরুদ্ধপক্ষ যখন ভুল করেই চলেছে, ওকে আর বাধা দিয়ে কী লাভ? এসব ঘটনার ফলে নিরীহ নিরপেক্ষ মানুষের ভাসমান ভোটগুলো আস্তে আস্তে ংযরভঃ হচ্ছে। অর্থাৎ সরে যাচ্ছে। একথা কি বিএনপি’র হাই কম্যান্ড এর নীতি নির্ধারকরা একটুও ভেবে দেখেছেন?
লেখক : দৈনিক প্রবাহের সাবেক জয়েন্ট এডিটর, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

