আমাদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন আমাদের স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতার জন্য সুদীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধ করতে হয়েছে। ১৯৭১-এর এই মহান মুক্তিযুদ্ধের ফলেই অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। এর জন্য আমাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, দিতে হয়েছে অনেক জীবন। এই মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বীর সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনীর সদস্য, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, কৃষক, শ্রমিক সর্বস্তরের মানুষ স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিল। এই মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জিয়াউর রহমান। সেনানায়ক শহীদ জিয়া রণাঙ্গনে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করে দেশকে শত্রুমুক্ত করে ইতিহাসে এক উজ্জল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাই’ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে জিয়াউর রহমান এক অত্যন্ত বলিষ্ঠ নাম, চিরস্মরণীয় এক নাম।
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতির আলোকে একটি শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায় বিচারের দ্বারা জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন করা। ‘৭১-এর মার্চের রক্তঝরা দিন গুলিতে দেশের মানুষ যখন নেতৃত্বের সংকটে দিশেহারা ও বিভ্রান্ত ঠিক তখনই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক শহীদ জিয়ার কন্ঠে আমরা পাই দিক নির্দেশনা, পাই স্বাধীনতার ডাক।
শহীদ জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের ডাকে মানুষ পায় প্রেরণা, হয় নতুন প্রাণের সঞ্চার। এরপরে চলে দীর্ঘ নয়মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে ২৭ মার্চের শহীদ জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল সঠিক ও সময় উপযোগী। তাঁর দুরদৃষ্টিসম্পন্ন ও সাহসী ঘোষণা জাতির ইতিহাসে তাই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
শহীদ জিয়াউর রহমান জাতির প্রতিটি সংকটকালে ত্রাণকর্তারূপে কাজ করেছেন। স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর অবদান যেমন ছিল অসাধারণ তেমনই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল অতুলনীয়। দেশ যখন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ অর্থাৎ বাকশালের এক দলীয় স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কবলে নিমজ্জিত তখনই শহীদ জিয়া আবার সঠিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাইতো তিনি ইতিহাসের পাতায় জননন্দিত নেতা।
আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিনষ্টের যে চক্রান্ত চলছিল, ১৯৭৫-এ শহীদ জিয়ার নেতৃত্বে এদেশের বীর সিপাহী ও জনতা তা নসাৎ করে দিয়ে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। তাঁর বলিষ্ট নেতৃত্বে একদিকে যেমন অনিশ্চত শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংযুক্ত হয় আত্মপ্রত্যয়ের এক নতুন সুর, আত্মনির্ভরশীলতার এক নতুন ব্যঞ্জনা আর জাতীয়তাবাদের স্বকীয়তা তেমনই আবার ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার মিলিত ঐক্যের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সংহত হয়ে এক নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিল।
এরপর সুচিত হয় অশুভ শক্তির বলয় থেকে মুক্ত হয়ে উন্মুক্ত বিশ্বের প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ার যাত্রা। শহীদ জিয়া বাকশালের একদলীয় শাসন পদ্ধতি বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করায় বাংলাদেশের রাজনীতির অন্তরাত্মা জাগরিত হয় নতুন প্রাণশক্তিতে যার ফলে অপচয়প্রবন, দুর্নীতি কবলিত সমাজতন্ত্রের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ। শহীদ জিয়ার নির্দেশে সংকোচন ও আধিপত্যমুক্ত হয়ে সংবাদপত্রের কন্ঠে আবারও ফুটে ওঠে ধ্বনি, নিয়ন্ত্রিত বিচার বিভাগ ফিরে পায় স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণের শক্তি। ব্যক্তি প্রাধান্যের কবল থেকে মুক্ত হয়ে রাজনীতির কলিগুলো বিকশিত হয়। আবার মৌলিক মানবাধিকার ফিরে পায় প্রাণের স্পন্দন। শহীদ জিয়া ১৯৭৭-এর ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁর সঠিক নির্দেশনার ফলেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে পরিলক্ষিত হয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন, আর সারা দুনিয়ার মানুষ অবাক হয়ে দেখেছিল মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সম্মানের জন্য বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ কিভাবে একতাবদ্ধ হয়ে অশুভচক্রের সকল অপপ্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র দৃঢ়তার সংঙ্গে প্রতিহত করে।
মানুষকে শিক্ষার আলো দিতে পারলে সে নিজেই খুঁজে নিবে তার বাঁচারপথ, এজন্য সরকারকে ভাবতে হবে না একথা বিশ্বাস করতেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাই তিনি বাংলাদেশের মানুষকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে দৃঢ়সংকল্প গ্রহণ করেন। দেশে বিপুল মানুষ অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত বলেই তারা কুসংস্কারাচ্ছন্ন, দারিদ্রপিড়িত, কলহপ্রবন, স্বাস্থ্যহীন, কর্মবিমুখ ও হীনমন্যতায় ভোগে-রাষ্ট্রপতি জিয়া এই বিষয়গুলি উপলব্ধি করেই শিক্ষা প্রসারে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রী পর্যায়ে এবং মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার ৯৫% বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছিল। এই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ তাদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে যখন আন্দোলন করছিলেন তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আন্দোলনরত শিক্ষক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় বসেন এবং তাদের বঞ্চনা ও পেশাগত দুরাবস্থার কথা বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন চাকরীবিধি নেই, আর নেই কোন বেতন স্কেল একথা জেনে কেবল বিস্মিতই হননি বরং এই লজ্জাজনক করুণ অবস্থার জন্য ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছিলেন। এরপর তাঁর নির্দেশেই ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ১ জানুয়ারি হতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জন্য চাকরীবিধি প্রবর্তন এবং জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভূক্ত করে সরকারি কোষাগার হতে বেতন স্কেলের ৫০% অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে এম. পি. ও -এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগার হতে অর্থ প্রদান ৫০% হতে ১০০% করা হয়। এটা ছিল শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর যুগান্তকারী পদক্ষেপ। শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডে যে গতির সঞ্চার করেছিলেন নিঃসন্দেহে তা ছিল বৈপ্লবিক। তাঁর একান্ত উদ্যোগের ফলেই কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বাণিজ্য, সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং খাল খনন, রাস্তা ও পুল নির্মান প্রতিটি ক্ষেত্রে এক নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। ক্ষেতে-খামারে, কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিই ছিল তাঁর লক্ষ্য। জিয়াউর রহমানের কর্মক্ষমতা ছিল অসীম। তিনি দেশের প্রতিটি পল্লীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে চলতেন বিদ্যুৎ গতিতে তাই’ত তিনি হয়ে উঠেছিলেন এদেশের চারণ প্রেসিডেন্ট।
শিশুকল্যাণের জন্যে শিশু একাডেমী, যুব উন্নয়নের জন্য যুব মন্ত্রণালয় এবং মহিলা সমাজের কল্যাণের জন্য মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সৃষ্টি করেন তিনি। তিনি দেশের ক্রীড়াবিদদের মানউন্নয়নের লক্ষ্যে ক্রীড়াঙ্গণের ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। যার ফলে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জল হয়। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা লাভের জন্যে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করেন এবং তাঁর দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের ফলেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্প্রীতি ও সৌহার্দমূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁরই প্রস্তাব ও উদ্যোগে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, ভারত, পাকিস্তান ও ভুটান এই ৭টি দেশের সমন্বয়ে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগী সংস্থা (সার্ক) গঠন করা হয় যার ফলে এঅঞ্চলে শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নবদিগন্ত সুচিত হয়। ২০০৫ খিস্টাব্দ ১২ই নভেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩তম সার্ক সম্মেলনে সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা শহীদ জিয়াকে স্বর্ণপদক প্রদান করে সম্মানিত করা হয়। সত্যিকার অর্থে বলা যায় তিনিই ছিলেন উন্নয়নমুখী বাংলাদেশের স্থপতি ও সফল রাষ্ট্রনায়ক।
শহীদ জিয়াউর রহমান ছিলেন বহুগুণের অধিকারী এক মহান মানুষ। তাঁর সততা ছিল প্রশ্নাতীত। নিষ্ঠার সঙ্গে দেশ ও দেশের মানুষকে তিনি ভালোবেসেছিলেন। তাঁর মত নির্লোভ রাষ্ট্রনায়ক খুব কমই পাওয়া যায়। দেশ থাকবে, দেশের মানুষ থাকবে, সভ্যতার অগ্রযাত্রা চলতে থাকবে আপন গতিতে। সময়ের ব্যবধানে নতুন নতুন রাষ্ট্রনায়ক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মত দেশপ্রেমী, সৎ, নিষ্ঠাবান, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, উদার, সাহসী, পরিশ্রমী, মানবহিতৈষী, অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী বিচক্ষণ নেতা বিরল। তাঁর অসাধারণ সাংগঠনিক কর্মদক্ষতা এবং সর্ববিষয়ে সজাগ ও সচেতন দৃষ্টি এ জাতির ভাগ্যোন্নয়নে এক চমৎকার গতিময়তা এনেছিল। আজ জাতির এই সংকটকালে তাঁরমত বিচক্ষণ নেতার প্রয়োজন ছিল খুব বেশী। তাই’ত সংকট উত্তরণে এই মহান নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এবং তাঁর নির্দেশিত পথেই যাতে আমরা চলতে পারি সেই প্রত্যাশাই করি।
লেখক : প্রাক্তন ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাবিদ

