শুরু থেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপি’র জন্য অতীতের যে-কোনো নির্বাচনের চেয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ৫ আগস্টের পর দলীয় যে-কোনো আয়োজনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বরাবরই তিনি এই সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন।
দলীয় অন্তর্কোন্দল, বিভেদ ও জনবিচ্ছিন্নতা নিরসন করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। তার এই বক্তব্য গুলোতে বোঝা যায়, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের অপেক্ষাকৃত সৎ, দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রাখতে চান তিনি। যেকারণে অতীতের আনুষ্ঠানিকতা উপেক্ষা করে গত ৩ নভেম্বর ২৩৭ আসনে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে বিএনপি। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় দেয়া হয় কড়া সতর্কবার্তা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠপর্যায়ে এই সতর্কবার্তা কতটা কার্যকর?
কারণ এরই মধ্যে বেশকিছু সংসদীয় আসনের প্রার্থিতা পরিবর্তনের জন্য ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় জনগণ। সড়ক অবরোধ, আগুন, বিক্ষোভ, ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় জোগসাজসের দায়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার বেশকিছু নেতাকে বহিষ্কৃতও করেছে দল। আবার দলের সর্বোচ্চ নেতার আদেশ মেনে অনেকে মুখবন্ধ করে হজম করছেন। এলাকার কর্মীসমর্থকদেরও ধৈর্য রাখতে সফল হয়েছেন। এটা নিশ্চিয়ই দলের প্রতি সেই সমস্ত নেতার আনুগত্য ও বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। কারণ আগেই বলা হয়েছে, ২৩৭ আসনে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা এখনও চূড়ান্ত নয়। সেকারণে গেলো ১৭ বছরে জেল-জুলুম খেটে স্রোতের বিপরীতে বুকটান করে দাঁড়িয়ে থাকা নেতারা এখনও প্রত্যাশার প্রহর গুনছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের কল্যাণে জানা যায়, সম্প্রতি বিরোধপূর্ণ আসনে প্রার্থী তালিকা পুনর্মূল্যায়নে দলের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন। নানাভাবে প্রান্তিকের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রশসংনীয়। এতে মাঠপর্যায়ে ত্যাগী নেতাদের অবশ্যই দলের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়ায়। গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যের অংশও বলা যায়।
তবে, এটুকুতেই থেমে থাকলে চলবে না। বিএনপিকে অবশ্যই প্রতিটি আসনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। প্রথমত এবং সবার আগে শনাক্ত করতে হবে সংশ্লিষ্ট আসনে রাজনৈতিক সঙ্কটগুলো কি? অনেক ক্ষেত্রে ভোটের রাজনীতিতে স্থানীয় রসায়নে প্রার্থীও প্রধান হয়ে ওঠে। বিষয়টি মাথায় রেখে সবার আগে উচিত সংসদীয় আসনটির ভোটের অতীত ফলাফলের ইতিহাস পর্যালোচনা করা। তারপর দলীয় হিসেব-নিকেষে প্রার্থী নির্বাচন। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আসনটি একসময় বিএনপি’র ঝুলিতে ছিলো। কিন্তু হঠকারী সিদ্ধান্তে সেটি পরবর্তীতে হাতছাড়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বসিয়ে দেয়া হয় বসন্তের কোকিল। সারা বছর খবর নেই, বসন্তে কু-কু। সু-সময়ে এই দুধের মাছিদের যন্ত্রণাও দলকে ডোবাতে পারে। এটি শুধু কথার কথা নয় বরং বস্তবতা।
এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ খুলনা-৬ আসন (পাইকগাছা-কয়রা)। উপকূলীয় এই আসনে পতিত আওয়ামী লীগও একই কাজ করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে স্থানীয় প্রার্থীদের উপেক্ষা করে শেকড় বিচ্ছিন্ন আক্তারুজ্জামান বাবুকে নির্বাচিত করে। ভোটারবিহীন নির্বাচনে তিনি এমপি হয়ে অপেক্ষাকৃত একটু বেশি পরিমাণেই শহুরে ভদ্রলোক বনে যান। ফলে ২০২১ সালের ১ জুন ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের পর খুলনার কয়রা উপজেলার দশহালিয়া এলাকায় ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ পরিদর্শনে গেলে উত্তেজিত এলাকাবাসী সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবুকে কাঁদা ও মাটি ছুড়ে মারেন। ক্ষুব্ধ জনতা এমপিকে তাড়া করে। একপর্যায়ে তিনি পুলিশি নিরাপত্তায় এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। এই ঘটনার পর থেকে তিনি ‘কাদা খাওয়া এমপি’ নামেও পরিচিতি পান। এতে কা-জ্ঞান ফেরে আওয়ামী লীগের। যেকারণে শেষবারের নির্বাচনে নানা প্রভাব বলয়মুক্ত হয়ে সবাইকে অবাক করে স্থানীয় নেতা রশীদুজ্জামানকে মনোনয়ন দেয়।
এখন যে কারণে আওয়ামী লীগ ‘কাদা খাওয়া এমপি’র দল হিসেবে উপকূলে পরিচিতি পায়- সেই একই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে বিএনপি? এটি এখন শুধু জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের নয় বরং পাইকগাছা-কয়রাবাসীর মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন! কারণ এরই মধ্যে প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় খুলনা-৬ আসনে ভিন্ন এলাকার বাসিন্দাকে বসানো হয়েছে। তিনি পাইকগাছা-কয়রা নয়, রূপসার মানুষ। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই আসনটি কি খোয়াতে বসেছে বিএনপি? নিশ্চিত জয় জেনে ফুরফুরে মেজাজে জামায়াতের প্রার্থী! অথচ খুলনা-৬ আসনটি মূলত বিএনপি’র। সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী এই আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে আসনটি বিএনপি’র ঘাঁটি বলে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে জোটবদ্ধ নির্বাচনের ভাগবাটোয়ারায় জামায়াতকে আসনটি ছেড়ে দেয়া হয় এবং দু’বার দলটি আওয়ামী লীগের বিপরীতে জয়লাভ করে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন বিএনপি পারে আসনটি উদ্ধার করতে। এখনও সেই সময় হাতছাড়া হয়নি। বরং তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেয়া গেলে নতুন করে জেগে উঠবে এলাকার মানুষ। বাকিটা বিএনপি’র নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। যদিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলীয় শৃক্সক্ষলা ভঙ্গের দেয়াল ডিঙানোর রব উঠেছে। অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ারও ঘোষণা দিয়ে ভার্চুয়ালি প্রচার-প্রচারণায় নেমেছেন।
অবশ্য বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলের সূত্র বলছে, “খুলনার ৬টি আসনের মধ্যে ৩টি আসনে দলীয় প্রার্থী পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন গেছে কেন্দ্রে। এর মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খুলনা-৬ আসন। বলা হচ্ছে, আসনটিতে জামায়াতের শক্ত প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপি’র অন্য এলাকার দুর্বল প্রার্থী দেয়ার অভিযোগপত্র জমা পড়েছে কেন্দ্রে। নতুন করে আলোচনায় এসেছে স্থানীয় দুয়েক জনের নাম।
তবে, সবচেয়ে এগিয়ে আছেন খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মোমরেজুল ইসলাম। এরই মধ্যে চূড়ান্ত পর্যালানোর জন্য অধিকতর খোঁজ খবর নেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় একটি টিমকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখন অপেক্ষার পালা। আওয়ামী লীগের মত একই ভুল কি বিএনপিও করবে? নাকি প্রান্তিকের প্রেরণায় নতুন পতাকা উড়িয়ে বিজয়ের সংগ্রামে মাঠে নামবে। বাকিটা সময়ই বলে দেবে।
তবে, শেষ পর্যন্ত যাই ঘটুক না কেন। অন্তত নতুন করে ‘কাদা খাওয়া এমপি’র তকমা নিতে চাইবে না বিএনপি।
খুলনা গেজেট/এনএম

