কথায় বলে, ‘সাপের লেখা, বাঘের দেখা।’ গুণীজনেরা তাদের অভিজ্ঞতার নির্যাস হিসেবে এমন সব কথা বলেছেন। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ নিয়তিবাদে বিশ্বাসী বলে এ ব্যাপারে বড় একটা সতর্ক নন। অথচ সতর্কতার অভাবে কত জীবন অকালে ঝরে যায়! ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে দুর্ঘটনা এবং অপঘাতে কত যে জীবন হারায় তার অধিকাংশের হিসাব আমরা রাখি না। কিন্তু হতভাগা যে সংসারে কোনো একটি জীবন ঝরে যায়, তারা জানে জীবন হারানোর ক্ষতি কি?
বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলে বর্ষা-শরৎকালে হাওড়ের জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো সর্প দংশনে মুহূর্তে বহু জীবনের তারা খসে যায়, শুধুমাত্র একটু সতর্কতার অভাবে। এর মধ্যে শরৎকাল মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে হঠাৎ বিদায়ের পর, বর্ষার ঝড়ো হাওয়ার কাঁপুনি দিয়ে উপদ্রুত হেমন্তে তাপমাত্রা হঠাৎ করে তেত্রিশ ডিগ্রি থেকে ছাব্বিশে নেমে গেছে। সবাই মোটামুটি শীতের আগমন প্রতীক্ষায়। হিমেল বাতাস হালকা শীত, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাইকে অক্টোপাসের মত স্পর্শ করেছে। নাতিশীতোষ্ণ এই হিমেল সময়ের বলয়ে সবাই মোটামুটি শীতের ওম ভোগ করছে।
এই মুহূর্তে গ্রাম অঞ্চলে পাকা বাড়ি হোক, আধা পাকা কিংবা মাটির ঘর হোক, সর্বত্র ওৎ পেতে রয়েছে জীবন ঘাতি একটি হিংস্র প্রাণী, ওর নাম সর্প বা সাপ। অসতর্ক মুহূর্তে গ্রামের বিত্তবানদের বাড়ি ঘরের চিলেকোঠায়, সিঁড়ি ঘরের নিচে মাসের পর মাস ফেলে রাখা আসবাবপত্রের পুরানো ভগ্নাংশ, কাঠ বাঁশের স্তূপের আড়ালে লুকিয়ে এরা বাসা বেধেছে। যেকোনো মুহূর্তে ওখানে আশ্রয় নেয়া ব্যাঙ পোকামাকড় এগুলো খাবারের লোভে, ওরা জীবন নাশকারী দুর্বৃত্তের মত আমাদের গৃহাঙ্গণে নিভৃতে আশ্রিত অবস্থায় ওৎ পেতে আছে। অসতর্ক মুহূর্তে যখন তখন জীবনঘাতী আঘাত হানতে পারে।
ভূমিকম্প, বজ্রপাত, বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে যারা প্রাণ হারান, নিঃসন্দেহে ওরা হতভাগ্য মানুষ। কিন্তু আমাদের উদাসীনতায় একটু সচেতনতার অভাবে, ঘরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিষধর সর্প সম্পর্কে আমরা কতজন খবর রাখি! ভেবেছিলাম অন্য প্রসঙ্গে কথা বলবো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে সর্প দংশন এবং অকালে প্রাণ হারানো মানুষের প্রতিবেদন পড়ে হতভাগ্য পরিবার গুলোর কথা লিখতে হলো। গ্রাম অঞ্চলের যারা সর্প দংশনের শিকার হয়, ওদের ভাগ্য এমনই খারাপ যে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে এর জন্য এন্টিভেনম যে ভ্যাকসিনটি জরুরি, তা বলা চলে অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ দীর্ঘকাল মজুত নেই। না থাকার কারণ অজ্ঞাত!
নড়াইলের গ্রাম অঞ্চলে সম্প্রতি সর্প দংশনের শিকার এক উঠতি যুবকের চিকিৎসার জন্য তাকে প্রথম গ্রাম্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ নেওয়া হলে, ভ্যাকসিন নেই বলে সঙ্গে সঙ্গে জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরের কথা বলে দেওয়া হয়। পরখ করে দেখেছি, বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলীয় জনপদে সর্প দংশনের শিকার বহু হতভাগ্য মানুষ অকালে প্রাণ হারান, কিন্তু সরকারি হিসাবের খাতায় এদের ভাগ্য বিপর্যয়ের কোনো কথা লেখা থাকে না। হায়রে স্বাধীন দেশ!
বলা বাহুল্য, অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার বিষধর সর্প আমাদের বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে কাঠঘরে কখনো বাড়ির নির্মাণ সামগ্রীর বিশাল স্তূপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। অসতর্ক হলে, সেখানে কোনো প্রয়োজনে গিয়ে কোনো কিছু নাড়াচাড়া করলে, মুহূর্তে ওরা ঘাতক হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায়, এক ঝটকায় জীবনবধ করতে সামান্য কসুর করে না। বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলে এদের উপদ্রব আছে, ছিল এবং থাকবে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, সর্প দংশনে গুরুতর আহত মুমূর্ষু রোগীর জীবন রক্ষার জন্য যদি দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন না রাখা হয়, তাহলে জীবন এভাবেই ঝরতে থাকবে।
কাল নাগিনীর ছোবলে বাংলাদেশের শহরে নগরে গঞ্জে গ্রাম গ্রামান্তরে অনেক মানুষের জীবন অকালে ঝরে যায়! আমাদের দেশে সিস্টেম রয়েছে, ‘ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা যায়!’ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ নজরদারি থাকলে, সাপ দংশনের পর যে ভ্যাকসিনটি জীবন রক্ষাকারী হিসেবে একান্ত দরকার, তা অবশ্যই মজুত রাখা উচিত। আরেকটি প্রসঙ্গে কথা বলতে হয়, শীতের মৌসুমে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ সহায় সম্পদ হারিয়ে পথে বসেছে – এ ব্যাপারটিও সরকারের ফায়ার সার্ভিস বিভাগ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের যৌথ অনুসন্ধানে ঘনবসতিপূর্ণ বিভিন্ন বস্তি এলাকা, মধ্যবিত্ত আবাসিক এলাকায় পর্যবেক্ষক টিমের মাধ্যমে অনুসন্ধান ও জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হলে, আমরা অগ্নিকা-ের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে অন্ততপক্ষে ৬০% সহায় সম্পদ রক্ষা করতে পারতাম। সমাজ সংসারে একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘গরিবের কথা বাসি হলে কাজে ফলে।’
আজকের প্রসঙ্গটি ছিল গ্রামাঞ্চলে লুকিয়ে থাকা কাল নাগিনীর ছোবলে মুহূর্তে প্রাণহরণ এবং আকস্মিক অগ্নিকা-ের ধ্বংসলীলা থেকে নিষ্কৃতির একটি সতর্ক প্রতিবেদন। কথাগুলো অত্যন্ত তুচ্ছ মনে হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই দু’টি বিষয়, আমাদের সামগ্রিক জনজীবনে যখন-তখন মৃত্যুর হাতছানি দিয়ে অধিকাংশ পরিবারকে পথের কাঙ্গাল বানিয়ে ছাড়ে। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের কৃপা দৃষ্টি অবশ্যই জনগণ প্রার্থনা করতে পারে। তাই নয় কি?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

