সাধারণত নতুন সহকর্মীরা পেশায় যুক্ত হয়ে প্রচুর কাজ করতে চান। কিন্তু সংবাদের উৎস সম্পর্কে তাদের ধারণা কম। বা বলা যায় প্রাপ্ত তথ্য নিশ্চিত হওয়ার প্রকৃত অথরিটি খুঁজে পান না। পুরোনো সহকর্মীরাও কাজ করতে করতে অনেককিছু করে ফেলেন। দীর্ঘ মাস-বছরও পেরিয়ে যায়, কিন্তু স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হতে সময় লেগে যায়। এক্ষেত্রে শুরুতেই যদি জানা থাকে তথ্যনিশ্চিতের খাতগুলো কি? তাহলে প্রান্তিক পর্যায়ে নিভুর্ল তথ্যপ্রাপ্তি একজন গণমাধ্যম কর্মীকে অন্যদের থেকে নিঃসন্দেহে আলাদা করে।
গণমাধ্যমকর্মীর সংবাদ সংগ্রহের উৎস :
১. পুলিশ স্টেশন থানা /ডিএসবি/ সিআইডি।
২. হাসপাতাল ।
৩. ফায়ার ব্রিগেড।
৪. বিমান বন্দর।
৫. নদী বন্দর।
৬. রেলওয়ে স্টেশন।
৭. কাস্টম অফিস।
৮. মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিস।
৯. সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান।
১০. ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।
১১. প্রেসনোট।
১২. প্রেস রিলিজ।
১৩. সামাজিক সংগঠন।
১৪. জেলা প্রশাসন।
১৫. উপজেলা প্রশাসন।
১৬. ইউনিয়ন পরিষদ।
১৭. বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
১৮. বিজিবি।
১৯. স্থল বন্দর।
২০. বিভিন্ন এনজিও।
২১. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
এক সময় সাংবাদিকতার জন্য একটি কলম, নোটপ্যাড এবং ছোটখাট হলেও একটি ক্যামেরা জরুরি ছিলো। সাংবাদিকের পকেটে কলম এবং ছোট্টনোটবুক। কাধে ছোট্ট ক্যামেরা। সময়ের পরিক্রমায় সেই কাল বদলেছে। এক মুঠোফোনেই মিলছে সবধরনের সুবিধা। তথ্যপ্রযুক্তির নানা সুবিধা সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমেও যুক্ত হয়েছে। যুক্ত হয়েছে না বলে যুক্ত হচ্ছে বলা যায়। বতর্মান সময়ের সংবাদ কর্মীকে প্রতিনিয়ত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে আধুনিক করে তুলতে হয়। এটা একদিকে যেমন বিষয়ভিত্তিক সংবাদের দরকারে অন্যদিকে, সব ধরনের সংবাদ তৈরির জন্যও। কারণ দৈনিক পত্রিকার প্রিন্ট ভার্সনের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকটি গণমাধ্যম এখন ডিজিটাল ভার্সনে যুক্ত হয়েছে। এ জন্য দরকার প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে ন্যুনতম ধারনা রাখা।
পত্রিকা, টেলিভিশন এবং ডিজিটাল প্লাটফর্ম :
নোটবুক, ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, মিনিক্যাসেট, ফোন, মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ই-মেইল, বাইসাইকেল কিংবা মোটরসাইকেল। একজন পেশাদার সাংবাদিকের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি একটি আধুনিক মুঠোফোন। সঙ্গে দ্রুতগতির ডাটা কানেকশন। হোক টেলিভিশন কিংবাদৈনিক পত্রিকা।
আমাদের তরুণ সংবাদকর্মীরা পেশার শুরুতেই সংবাদের বিষয় নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ভোগেন। তিনি বুঝতে পারেন না- কোন বিষয়টি সংবাদ এবং কোনটি সংবাদ নয়। প্রায়ই ঘটনা এবং দুর্ঘটনার মতো সংবাদ এবং অসংবাদকে মিলিয়ে ফেলেন। সাধারণত সংবাদের বিষয়বস্তু মোটা দাগে এমন বলা যায়। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত যে সংবাদগুলো আমরা স্বাভাবিকভাবেই হাতে পেয়ে যাই।
গণমাধ্যমে সংবাদের বিষয়বস্তুসমূহ :
খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, দুর্ঘটনা, অপহরণ, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, সন্ত্রাস, অগ্নিকান্ড, যৌতুক, আইন-শৃঙ্খলা, সমস্যা ও সংকট, পরিবহন, রাস্তা, কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রোগ-ব্যাধি, চিকিৎসা, আদালত সংক্রান্ত, ব্যাংক বিমা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নদ-নদী, কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশু, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিদ্যৃৎ, রাজনীতি ইত্যাদি।
সংবাদ প্রস্তুতির কাঠামোগত কৌশল:
বাংলায় বলা হয় ‘ষড় ক’ ফর্মুলা । যেমন:
১. কে?
২. কবে?
৩. কখন?
৪. কোথায়?
৫. কিভাবে?
৬. কেন?
এই প্রশ্নগুলোর পরম্পরায় উত্তরগুলো সুবিন্যাস্ত বিন্যাস করা গেলে চমৎকার একটি সংবাদ হয়ে ওঠে।
উদাহরণ: এক ব্যক্তি খুন হয়েছে। ‘ষড় ক’ ফর্মুলায় একজন সাংবাদিক সোর্সের কাছে প্রশ্ন করবেন এই ভাবে-
১. কে খুন হয়েছে?
২. কবে খুন হয়েছে?
৩. কখন খুন হয়েছে?
৪. কোথায় খুন হয়েছে?
৫. কিভাবে খুন হয়েছে?
৬. কে খুন করেছে?
একজন ভালো বা দক্ষ সংবাদকর্মী সেই যার সর্বস্তেও সোর্স রয়েছে। সোর্স নিয়োগের ক্ষেত্রে অবলম্বন করতে হবে বিশেষ সতকর্তা। সোর্স নিয়োগের আগে দেখতে হবে বিষয়টি সম্পর্কে সে স্পষ্ট জ্ঞান রাখে কি না? সংশ্লিষ্ট সংবাদের ব্যাপারে তিনি কতটা নিরপেক্ষ? না হলে প্রতিবেদনটি ভ্রান্ত হবে।
টেলিভিশন ও পত্রিকার সংবাদ শিরোনাম:
সংক্ষিপ্তভাবে চমকপ্রদ বাক্যে সংবাদের শিরোনাম হবে। যেন পাঠক/দর্শকের সংবাদটির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর সূচনা অংশ। সূচনা অংশে সংক্ষিপ্ত এবং মূলতথ্যের নির্যাস থাকতে হবে। সংবাদের মধ্যে যিনি যতবেশি তথ্য সংযোজন করতে পারবেন তার সংবাদটি পাঠকের কাছে ততবেশি গ্রহণযোগ্য হবে। সংবাদিকের নিজের কোন কথা সংবাদের মধ্যে সংযোজন করা যাবে না।
শুদ্ধ বানান ও চমকপ্রদ বাক্যগঠন :
সর্বোপরি সংবাদ কর্মীকে নিভুর্ল বানানে সংবাদ লিখতে হবে। টেলিভিশনে সংবাদের লিখিত রূপ দেখা না বলে ইচ্ছেমতো ভুল বানানে লেখা যাবে না। কারণ আপনার লেখার অংশ থেকেই হেডলাইন, সুপার, গ্রাফিক্স করেন ডেস্কের সহকর্মীরা। আপনি শুদ্ধ বানানে লিখলে আপানার টেলিভিশনের ডেস্ক আপনার প্রতি আলাদা মূল্যায়ন করবে। সবশেষ ভালো সাংবাদিক হতে হলে নিয়মিত পড়ালেখার বিকল্প নেই। সাহিত্য থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু। কবিতা থেকে বাক্যগঠনের দক্ষতা শিখতে পারেন। গল্প-উপন্যাস ও নিবন্ধ-প্রবন্ধ থেকে বাক্যের গাঁথুনি শিখতে পারেন।
মূলত সাংবাদিক হওয়ার জন্য শিক্ষার কোনো উল্লেখযোগ্য মাপকাঠি নেই বলে অতীতের তাবৎ উদাহরণ পেশ করা হলেও পরিস্থিতি বদলেছে। কারণ একজন সাংবাদিককে এখন শুধুমাত্র বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না। তাকে ভাষাগত দক্ষতার সঙ্গে আইন, সংবিধান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ের প্রাথমিক জ্ঞান রাখতে হয়। ক্ষেত্র বিশেষ জানতে হয় আরও বাড়তি কিছু। এ জন্য ন্যুনতম স্নাতক হওয়া জরুরি। এটি নিতান্তই আমার উপলব্ধি। বতর্মান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এটা আরও বেশি দরকার। তবে, প্রাথমিকভাবে একজন গণমাধ্যম কর্মীর ভাষা, বানান ও বাক্যগঠন সম্পর্কে সতর্ক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। একই সঙ্গে একজন সাংবাদিকের মানসিক ও শারীরিক যোগ্যতা থাকতে হয়। একদিকে যেমন হবেন মেধাবী, স্মার্ট ও প্রাণচাঞ্চল্যে পরিপূর্ণ- ঠিক অন্যদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় থাকতে হবে ধৈর্য, সাহস ও সহনশীল মানসিকতা। প্রস্তুতিপর্বের প্রাথমিক দক্ষতা অর্জনের পর সাংবাদিককে নিরপেক্ষ হওয়া বাধ্যতামূলক। পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাকও একজন সাংবাদিককে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
খুলনার সন্তান হিসেবে প্রত্যাশা থাকবে- দৈনিক খুলনা গেজেট দক্ষ কর্মিবাহিনী গড়ে তুলতে বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেবে এবং গণমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে। শহর থেকে গঞ্জে প্রতিজনের চায়ের টেবিলে পৌঁছে যাক দৈনিক খুলনা গেজেট। পুরনোর ভিড়ে নতুনের কেতন ওড়ানো পর্বে আবারও দূরপ্রান্তের শুভেচ্ছা।
লেখক : কবি ও গণমাধ্যমকর্মী ইনচার্জ, ন্যাশনাল ডেস্ক এখন টেলিভিশন
খুলনা গেজেট/এএজে