Edit Content
খুলনা, বাংলাদেশ
শনিবার । ৩০শে আগস্ট, ২০২৫ । ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩২
Edit Content

অবাধ তথ্য-প্রবাহের প্রত্যয়ে দৈনিক খুলনা গেজেট

প্রফেসর মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান

পৃথিবীর ইতিহাস সুদীর্ঘ হলেও সংবাদপত্রের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানব সভ্যতা যখন বিকশিত হতে শুরু করল তখন থেকেই মানুষের জানবার আকাঙ্খা সৃষ্টি হল এবং ক্রমান্বয়ে সংবাদ বুভূক্ষা বাড়তে থাকল। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নব নব আবিষ্কারের ফলে বিভিন্ন সংবাদ-মাধ্যম মানুষের তথ্য তৃষ্ণা মেটানোর প্রয়াস পেল। মুদ্রণযন্ত্রের ব্যাপক প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক সংবাদপত্রের উদ্ভব হয়। ইতিহাসের গতিধারার আলোকে উল্লেখ করতে হয় যে, ব্যক্তি স্বাধীনতা তখনই হারিয়ে যায় যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ করার অধিকার থাকে না, বাক স্বাধীনতা হারিয়ে যায়। একথা খুবই সত্য যে, যুগে যুগে শাসক তার আধিপত্য কায়েম রাখতে, অপশাসনের দ্বারা সহজে নিপীড়ন, নির্যাতন আর শোষণ চালিয়ে যাওয়ার জন্যে মানুষের মত প্রকাশের মৌলিক অধিকার খর্ব করে। মানুষের বাক স্বাধীনতা, সত্য ও ন্যায়সঙ্গত মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে বিভিন্ন দমনমূলক আইন জারি করে।

একটি স্বাধীন দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের শুদ্ধ চর্চার পূর্বশর্ত হল সংবাদপত্র তথা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা। অথচ বাস্তবতা হল যে, বিশ্বের কি উন্নত, আর কি উন্নয়নশীল বা অনুন্নত প্রায় প্রতিটি দেশেই সংবাদপত্র প্রকাশনার উষালগ্ন থেকেই সরকারের সঙ্গে সংবাদপত্র সেবীদের দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে উঠে। তাই’ত দেশে দেশে শাসকবর্গ সংবাদপত্র প্রকাশনাকে সাধারণত সুনজরে দেখে না। আর সে কারণেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে হরণ করতে তৎপর হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে শাসক বর্গ তাদের অপশাসনকে বৈধতা দিতে বা নিজেদের হীন স্বার্থ হাসিলের জন্যে ছলে বলে কৌশলে সংবাদপত্রসহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে তাবেদার সংবাদ মাধ্যম সৃষ্টি করতে দ্বিধা করে না।

বিশ্বের সর্বপ্রথম মুদ্রিত আকারে কখন এবং কোথায় হতে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল তা বেশ কিছুটা অস্পষ্ট থাকলেও একথা নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারী জেমস্ অগাস্টাস হিকি কিছুটা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই কোলকাতা হতে সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ ভারতীয় সংবাদ প্রচারের ইতিহাসে এক স্মরণীয় বছর। ঐ বছর ২৯ জানুয়ারী জেমস অগাস্টাস হিকি ব্রিটিশ ভারতে প্রথম সংবাদপত্র ‘The Bengal Gazette’ প্রকাশ করেন। তাই’ত অগাস্টাস হিকিকে অবিভক্ত ভারতে সংবাদপত্রের জনক বলা হয়। তাঁর বেঙ্গল গেজেটের মাস্ট হেডের নীচে লেখা থাকত- ‘A Weekly Political and Commercial Paper open to all, but influenced by none’.

এরপর পর্যায়ক্রমে বেশ কয়েকটি ইংরেজী পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাঙ্গালীর নব জাগরণের অন্যতম পুরোধা রামমোহন রায় ছিলেন উদার ও প্রগতিশীল চিন্তার জাগ্রত মনের অধিকারী এক মানুষ। তিনি অনুভব করেছিলেন যে হিন্দু সমাজের জীবন ব্যবস্থার সংস্কারের জন্যে বক্তৃতার চেয়ে সংবাদপত্র ও পত্রিকা অধিকতর কার্যকরী ও শক্তিশালী মাধ্যম। সে কারণে তিনি সংবাদপত্র প্রকাশনায় আত্মনিয়োগ করেন। এক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল শ্রীরামপুর মিশনের জন ক্লার্ক মার্শমানের সম্পাদনায় ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে প্রকাশিত প্রথম বাংলা সাময়িক পত্র ‘মাসিক দিগদর্শন’।

ঐবছরের ২৩ মে মার্শমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র ‘সমাচার দর্পণ’। তবে এর সম্পাদনার কাজে সহায়তা করেন জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, তারিণী চরণ শিরোমণি প্রমুখ। সমাচার দর্পণ শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে নতুন প্রাণস্পন্দন নিয়ে আসে।

এরপর ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দেই হরচন্দ্র রায়ের প্রকাশনা ও গঙ্গা কিশোর ভট্টাচর্যের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে বাঙালী পরিচালিত প্রথম সাপ্তাহিক ‘বঙ্গাল গেজেট’। তবে এই পত্রিকা প্রকাশনার নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন রামমোহন রায়। শ্রীরামপুর মিশনারীদের সঙ্গে মত পার্থক্য হওয়ায় রামমোহন রায় ১৮২১ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ব্রাহ্মণ সেবধি’ ও ‘সংবাদ কৌমুদী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। এছাড়াও তিনি ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি ভাষায় ‘মিরাৎ-উল- আখবার’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন যা পরের বছরই সাংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ বিধির কারণে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। পর্যায়ক্রমে আরও সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। বাংলার নবজাগরণের কালে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের পর যেসব বাংলা সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ লাভ করে পাঠক সমাজের সংবাদ তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: “সংবাদ কৌমুদী (১৮২১ খ্রিঃ), সমাচার চন্দ্রিকা (১৮২২ খ্রিঃ), বঙ্গদূত (১৮২৯ খ্রিঃ), সংবাদ প্রভাকর (১৮৩১ খ্রিঃ), জ্ঞানান্বেষণ (১৮৩১ খ্রিঃ), সংবাদ ভাস্কর (১৮৩১ খ্রিঃ), বেঙ্গল স্পেক্টের (১৮৪২ খ্রি), তত্ত্ববোধনী (১৮৪৩ খ্রিঃ), এডুকেশন গেজেট (১৮৫৬ খ্রিঃ), সোমপ্রকাশ (১৮৫৮ খ্রিঃ), অমৃতবাজার (১৮৬৮ খ্রিঃ), সুলভ সমাচার (১৮৭৩ খ্রিঃ) ইত্যাদি”।

এরপর বাংলার মুসলিম সমাজের ধমীর্য় সামাজিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতা দূর করার লক্ষ্যে সমকালীন মুসলিম চিন্তাবিদ, লেখক, সমাজসেবী মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতার জনক মাওলানা আকরাম খাঁ এগিয়ে এলেন সংবাদপত্রের জগতে। শুরু হল বাংলার সংবাদপত্রের অঙ্গনে মুসলিম চিন্তাবিদ, লেখক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের যাত্রা। বাংলার মুসলমানদের দ্বারা প্রকাশিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী আখবার’। এটি কাজী আব্দুল খালেকের সম্পাদনায় ২৪ পরগনার শিয়ালদহ থেকে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বাংলা ও উদ্দু দ্বিভাষিক পত্রিকা এবং পরের বছর হতে সাপ্তাহিক পত্রিকা রূপে প্রকাশিত হতে থাকে।

এরপর ধারাবাহিক ভাবে মুসলমান সাহিত্যিক সাংবাকিদের উদ্যোগে যেসব সংবাদপত্র ও পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দৈনিক হাবলুল মতিন (১৯০৯ খ্রিঃ), সাপ্তাহিক মোহাম্মদী (১৯১০ খ্রিঃ), মাসিক আল এছলাম (১৯১৪ খ্রিঃ), সন্ধ্যা দৈনিক নবযুগ (১৯২০ খ্রিঃ), সাপ্তাহিক সেবক (১৯২১ খ্রিঃ), অর্ধ সাপ্তাহিক ধুমকেতু (১৯২২ খ্রিঃ), সাপ্তাহিক লাঙল (১৯২৫ খ্রিঃ) দৈনিক ছোলতান (১৯২৬ খ্রিঃ), দৈনিক আজাদ (১৯৩৬ খ্রিঃ) ইত্যাদি।

পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) ভূখন্ডে প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা “রংপুর বার্তাবহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কালীচরণ রায়। ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে (১২৫৪ বঙ্গাব্দ) গুরুচরণ রায়ের সম্পাদনায় রংপুর হতে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। তবে প্রেসের স্বাধীনতা হানিকর ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের আইন নং-১৫ প্রয়োগ করে ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ‘রংপুর বার্তাবহ’ পত্রিকাটি বিলুপ্ত করা হয়। প্রথম ইংরেজী সংবাদ পত্র ‘ঢাকা নিউজ’ ১৮৫৬ খ্রিঃ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৪৭-এ ব্রিটিশ বিদায় নিল এবং ভারত বিভক্ত হল। আর দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারতের জন্ম হল। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবর মাসে মাওলানা আকরাম খাঁ সম্পাদিত দৈনিক আজাদ পত্রিকা কলকাতা হতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (পূর্ববাংলা) রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করে প্রকাশিত হল। এরপর ঢাকায় প্রকাশিত হল দৈনিক সংবাদ (১৯৫১ খ্রি:), দৈনিক ইত্তেফাক (১৯৫৩) খ্রিঃ। তারপর প্রকাশিত হতে থাকে অন্যান্য বাংলা ও ইংরেজী দৈনিক, সাপ্তাহিক ও সামায়িক পত্রিকা। এসব পত্রিকাগুলির মধ্যে যেমন জাতীয় পর্যায়ের পত্রিকা রয়েছে তেমনই আছে আঞ্চলিক পর্যায়ের পত্রিকা। ঢাকার বাইরে অন্যান্য মফস্বঃল শহরের মত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে অবিভক্ত ভারতের খুলনাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুদ্রিত সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। অবিভক্ত বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের জনপদ (বর্তমান বাংলাদেশ) খুলনা ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে জেলায় রূপান্তরিত হয়ে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে খুলনা পৌরসভা গঠিত হয়। খুলনা সদর মহকুমার সঙ্গে সাতক্ষীরা মহকুমা ও বাগেরহাট মহকুমা নিয়ে খুলনা জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সবের আগেই ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে খুলনা থেকে প্রকাশিত হয় সাময়িক পত্রিকা ‘সমাজ দর্পণ’। যশোদা নন্দ সরকারের সম্পাদনায় এই ‘সমাজ দর্পণ’ই খুলনার প্রথম প্রকাশিত পাক্ষিক পত্রিকা। এরপর ক্রমাগতভাবে খুলনা হতে অনেক সাময়িক পত্রিকা ও দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। আবার বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর মধ্যে অনেক সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রিকা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে এই সকল পত্রিকার মাধ্যমে যেমন সচেতন পাঠক সৃষ্টি হয়েছে তেমনই যোগ্য ও দক্ষ সংবাদপত্র সেবী ও কমীর্ গড়ে উঠেছে। আর আমাদের সমাজ পেয়েছে একটা সংবাদপত্র ও পত্রিকার জগৎ।

আনন্দের বিষয় বাংলাদেশের গণমানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, জীবন সংগ্রাম, উন্নয়ন-অগ্রগতি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনীতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার প্রত্যয়ে প্রিন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে দৈনিক খুলনা গেজেট। অর্থাৎ মুদ্রিত আকােও দৈনিক খুলনা গেজেট যাত্রা শুরু করছে। এই আনন্দঘন মুহুর্তে এর প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকাশক, সম্পাদক, সাংবাদিকসহ এই পত্রিকার সকল কর্মীকে জানাই অভিনন্দন। আর সেই সঙ্গে, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সকল প্রকার দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনে সর্বোপরি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিনির্মাণে দেশের অন্যতম মুখপত্রের ভূমিকায় দৈনিক খুলনা গেজেটকে দেখতে পাব এই প্রত্যাশায় করি।

লেখক : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রাক্তন ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন