খুলনার সংবাদপত্রের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ ও গৌরবময়। তবে এই অঞ্চলের প্রথম সংবাদপত্র কোনটি? তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত এখানে বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে “যশোর-খুলনা গেজেট” বিশেষভাবে উলেখযোগ্য। ধারণা করা হয়, এটি খুলনা থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র হলেও মূলত যশোর থেকেই এর প্রকাশনা শুরু হয়েছিল।
এরপর সময়ের দাবিতে খুলনায় বহু সম্ভাবনাময় পত্রিকার জন্ম হলেও অনেক প্রকাশনা টিকে থাকতে পারেনি। তবে সংবাদপত্রের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে অনলাইন নিউজ পোর্টাল। বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘বিডি- নিউজ২৪’, যা চালু হয় ২০০৫ সালে। এরপর একে একে বহু অনলাইন পোর্টাল সংবাদ মাধ্যমকে দেয় এক নতুন রূপ।
এই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে খুলনায় একজন মেধাবী ও প্রতিশ্রম্নতিশীল সাংবাদিকের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে ‘খুলনা গেজেট’। করোনাকালে যখন ছাপা পত্রিকার কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, তখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এই খুলনা গেজেট পাঠকের কাছে হয়ে ওঠে আশার প্রদীপ। একদল তরুণ ও প্রতিশ্রম্নতিশীল সাংবাদিকদের নিরলস পরিশ্রমে খুলনা গেজেট দ্রুত পরিচিতি পায়। বিশেষ করে প্রবাসে থাকা খুলনার মানুষদের জন্য এটি হয়ে ওঠে আপন ও নিত্যসঙ্গী। ক্রমেই পাঠক স্বপ্ন দেখতে শুরু করে পত্রিকাটি একদিন ছাপার অক্ষরে ধরা দিবে। আজ পাঠকের দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন পূরণের পথে অনলাইন থেকে প্রিন্ট সংস্করণে রূপান্তরের সাহসী যাত্রায় পা রাখছে খুলনা গেজেট।
এই নতুন যাত্রায় পাঠক হিসেবে পত্রিকাটির কাছে প্রত্যাশা অনেক-
১.স্থানীয় সংবাদ গ্রহণে অগ্রাধিকার: বিশ্বের খবর এখন অনলাইনে সহজলভ্য, কিন্তু প্রিন্ট সংস্করণে চাই স্থানীয় সমস্যা, সাফল্য ও সংস্কৃতির প্রতিফলন। সুন্দরবন আমাদের দক্ষিণ অঞ্চলের গর্ব। সুন্দরবন তথা উপকূলের পরিবেশপ্রতিবেশ, মানুষের জীবন যাত্রা, সমস্যা-সম্ভাবনার মুখপাত্র হয়ে উঠুক খুলনা গেজেট।
২. খুলনার ক্রীড়া ও সাহিত্য: খুলনার দৈনিক পত্রিকাগুলো ক্রীড়া ও সাহিত্য সাময়িকী নিয়ে আগ্রহ কম। কিন্তু সমাজ গঠনে সাহিত্য ও খেলাধুলা অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাহিত্য, কবিতা, শিল্প-সমালোচনা ও সাংস্কৃতিক আলোচনার মাধ্যমে গড়ে উঠুক এক প্রাণবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমুল। খুলনা গেজেট কবি ও সাহিত্য প্রেমিদের দর্পন হয়ে উঠুক।
৩.জনমত গঠন: সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি করা এবং জনমত গঠনে সহায়তা করা। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাক স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ইত্যাদি বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে খুলনা গেজেট সহায়ক শক্তি হয়ে উঠুক।
৪. ছাপার জগতে আলাদা অবদান: কাগজের পাতায় ছাপা অক্ষরের সৌরভের সঙ্গে যেন থাকে উন্নত মানের কাগজ, নিখুঁত প্রিন্টিং ও আকর্ষণীয় লে-আউট।
৫. নিয়মিততা ও সময়নিষ্ঠতা: প্রতিদিন সকালে চা-কফির সঙ্গে সংবাদপত্র হাতে পাওয়ার যে আনন্দ, সেটি যেন সময়মতো পৌঁছে যায় পাঠকের কাছে।
৬.গুণগত সাংবাদিকতা: গুনগত সাংবাদিকতায় খুলনা গেজেটের আপোষহীন ভূমিকা পাঠক অনুভব করে। প্রিন্ট সংস্করণে চাই গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন, বিশেষণমূলক ফিচার ও সত্যনিষ্ঠ উপস্থাপন। গভীর চিন্তাশীল লেখা থাকুক এই পত্রিকায়।
৭. বিশেষ সংখ্যা ও সংগ্রহনীয় উপাদান: ঐতিহাসিক ঘটনা, গভীর সাক্ষাৎকার বা অনন্য আর্কাইভভিত্তিক ক্রোড়পত্র সংযোজিত হলে পাঠকের কাছে তা হয়ে উঠবে সংগ্রহযোগ্য।
৮. পাঠক সম্পৃক্ততা: চিঠিপত্র, মতামত কলাম বা পাঠকের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের মাধ্যমে গড়ে উঠুক একটি নিবিড় কমিউনিটি। এছাড়া শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী ও মেয়েদের জন্য থাকতে পারে সাপ্তাহিক আয়োজন। ধর্মীয় বিশেষ দিন ও রমজানে ধারাবাহিক বিশেষ আয়োজন থাকতে পারে প্রিন্ট সংস্করণে।
৯. ডিজিটাল ও প্রিন্টের সহাবস্থান: প্রিন্ট সংস্করণে ছজ কোড যুক্ত করে অনলাইন কনটেন্ট বা ভিডিওতে পাঠকের প্রবেশাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
১০.নাগরিক জীবনের সমস্যা সম্ভবনা নিয়ে প্রতিবেদন হোক প্রতিদিনের অনুষঙ্গ।
১১.সাশ্রয়ীমূল্য ও সাবস্ক্রিপশন সুবিধা: সুলভ মূল্যে দীর্ঘমেয়াদি সাবস্ক্রিপশন প্যাকেজ, আর্কাইভ অ্যাক্সেস বা ই-পেপারের সুযোগ থাকুক।
অতএব, প্রিন্ট সংস্করণের এই নতুন যাত্রা শুধু সংবাদ নয়, বরং পাঠকের অনুভূতি, প্রত্যাশা ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠুক।
লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও কবি
খুলনা গেজেট/এএজে