বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নদ-নদী বিধৌত এক অতুলনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশে খুলনার অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ইতিহাসে এর মর্যাদাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। খুলনার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর উপকূল বরাবর সবুজ ঘনপল্লব পরিবেষ্টিত দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে খুলনার অবদান অনস্বীকার্য। ইতিহাস ও প্রাচীন ঐতিহ্য কোনো কোনো বিশেষ বিষয়কে সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে রাখে। সে প্রেক্ষিতে প্রাচীন ইতিহাসের দিকে তাকালে খুলনার বিবরণ পাওয়া যায় মহারাজ হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাং এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে। এর পরবর্তী ইতিহাস বিভিন্ন তথ্যসম্বলিত এক ঘটনাপঞ্জি। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে নয়াবাদ নামক স্থানে খুলনা শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিলো। ১৮৪২ সালে তখন ইংরেজ শাসন। নয়াবাদে থানার সাথে কিছুদিন পর খুলনা মহাকুমা সদর প্রতিষ্ঠিত হয়।
কিন্তু কালক্রমে নয়াবাদের গুরুত্বে ভাটা পড়ে। ফলে ভৈরব নদীর দক্ষিণ পশ্চিম পাড়ে খুলনার গোড়াপত্তন ঘটে এবং তথায় নতুন শহর স্থানান্তরিত হয়। অবিভক্ত বাংলার প্রথম মহাকুমা হলো খুলনা। তখন জেলা সদর ছিলো যশোরে। তারপর শুরু হয় ধীরে ধীরে এর উন্নতি, ভৌগলিক পরিবর্তন ও অগ্রযাত্রা । ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে সাতক্ষীরা মহকুমা সৃষ্টি হয় এবং ১৮৬৩ সালে স্থাপিত হয় বাগেরহাট মহকুমা। খুলনা ও বাগেরহাট তখন যশোর জেলার মধ্যে ছিলো আর সাতক্ষীরা ২৪ পরগনার মধ্যে ছিলো। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে যশোর হতে খুলনা ও বাগেরহাট এবং ২৪ পরগনা হতে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ ও বসন্তপুর নিয়ে খুলনা জেলা গঠিত হয়। এ সময়ে খুলনা জেলার প্রথম জেলা ম্যাজিস্টে্রট ছিলেন মিস্টার ক্লে। আজও খুলনার ক্লে রোড যার স্মৃতি বহন করে। খুলনা জেলার আয়তন ছিলো ৪,৬৩০ বর্গমাইল ও মোট লোক সংখ্যা ছিলো ৪৩,৫০০। ১৮৮৪ সালে একে দ্বিতীয় মিউনিসিপ্যালিটি ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটে এবং পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি দেশ জন্মলাভ করে। খুলনা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অংশে পড়ে। ১৯৫৪ সালে খুলনা শহরের অদূরে পশুর নদীর তীরে চালনায় একটি সমুদ্র বন্দর স্থাপিত হয় ও পরবর্তীতে বন্দরটি মংলায় স্থানান্তরিত করা হয়।
খুলনার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৬০ সালে খুলনা বিভাগীয় শহরে উন্নীত হয়। খুলনার নামকরণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যশোর ‘কালনিয়া’ হতে এর উৎপত্তি, কেউ কেউ মনে করেন ডুবে যাওয়া ‘ফল মাউথ জাহাজ’- এর নাম হতে এর উৎপত্তি। কেউ কেউ মনে করেন উজানীনগর অধিপতি চাঁদ সওদাগরের দ্বিতীয় স্ত্রী খুল্লনা দেবীর নামে খুলনেশ্বরী মন্দিরের নাম হতে খুলনা নামের সৃষ্টি। আজ খুলনা মেট্রোপলিটন শহর ১৮ লক্ষ জনসংখ্যার একটি বুদ্ধিষ্ণু নগরী। শহরতলী খালিশপুরে রয়েছে একটি সুসজ্জিত নৌঘাটি। যাতায়াত ব্যবস্থারও যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। পূর্বে খুলনা অঞ্চল লবণ ও গুড় শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিলো। পরবর্তীতে মৎস ও বনজ শিল্পের প্রসার ঘটে। এছাড়াও পাট শিল্প, নিউজপ্রিন্ট, বস্ত্রশিল্প, লৌহ-ইস্পাত, ঔষধ শিল্প, ভৈরবের তীরে হার্ডবোর্ড মিল ও ১৯৫৪ সালে একটি শিপইয়ার্ড স্থাপিত হয়।
১৯৭১ সালে বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্ত ক্ষয়ের ফলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ নাম ধারণ করে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে মানচিত্রে স্থান করে নেয়। যেহেতু খুলনার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন, তাই ইংরেজ আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়লেও খুলনা শহরের বৃদ্ধির সাথে এর উন্নতি ঘটে। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে খুলনায় এক বিশেষ ঐতিহ্য গড়ে ওঠে’ খুলনা বেতার সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রেখে চলেছে। খুলনায় বর্তমানে দৈনিক খবরের কাগজ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে যা খুলনার উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছে। এর মধ্যে খুলনা গেজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসার দাবিদার। অনেকের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে খুলনা প্রেসক্লাব। খেলাধুলার ক্ষেত্রেও খুলনা রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। ভবিষ্যতে এ শহরকে একটি পরিকল্পিত সুন্দর শহরে গড়ে তোলা এক নতুন মাত্রা অর্জন হবে বলে আশা করা যায়।
সর্বোপরি, খুলনা হতে মো. মাহমুদ আহসান কতৃর্ক সম্পাদিত ও প্রকাশিত অনলাইন খুলনা গেজেট পোর্টালটি এতদাঞ্চলের সচেতন পাঠক তথা সুহৃদগণের নিকট অত্যন্ত সুপরিচিত। দেশ বিশেষ করে খুলনা বিভাগ তথা এতদাঞ্চলের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও উদ্ভুত সমস্যাসমূহের খবরাখবর পোর্টালটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রতিদিন পৌঁছে দিয়ে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। যেখানে আঞ্চলিক অগ্রগতি সূচনা হয়, সেখানে কিছু সংকট ও সমস্যা মাথাচাড়া দিতে পারে, তবুও সম্ভবনা কখনও হারিয়ে যায় না। এসব সংকট, অগ্রগতি ও সাফল্যের ব্যাখ্যা নিয়ে খুলনা গেজেট বিগত পাঁচ বছর ধরে সকলপ্রকার তথ্য ও সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করে আসছে। দেশ ও অঞ্চলভিত্তিক ছাড়াও, বিদেশের প্রতিদিনের বিশেষ বিশেষ খবরগুলোও সরবরাহ করে থাকে। খবর ব্যতীত জীবনের সাথে ওতপ্রতভাবে জড়িত বিষয়াবলী যেমন ধর্ম, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সাহিত্য, রান্নাবান্না, আচার-অনুষ্ঠান, বিশেষ ব্যাক্তিদের মতবাদ, লাইফ-স্টাইল, মুক্ত ভাবনা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সোশাল মিডিয়া, আলোচনা ও নতুন উদ্ভাবনীর সচিত্র প্রতিবেদন এই পোর্টালটি উপস্থাপন করে থাকে যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য যথেষ্ট প্রয়োজনীয়, জীবনগঠনমূলক ও কল্যাণকর। বিগত পাঁচ বছর ধরে খুলনা গেজেটটি নিঃস্বার্থভাবে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ এবং খুলনা বিভাগ তথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ সরবরাহ করে এক বিশেষ অবদান সৃষ্টি করেছে।
এক্ষণে অনলাইন নিউজপোর্টালটি ’দৈনিক খুলনা গেজেট’ নামে কতৃর্পক্ষ দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা আমার বিশ্বাসমতে পাঠকের হৃদয় গভীরে আরও প্রতিফলন সৃষ্টি করবে। ‘দৈনিক খুলনা গেজেট’ এর প্রকৃত মূল্যায়নই পত্রিকার দৈনন্দিন প্রকাশনার সাথে অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত। তবুও যোগ্যতার মাপকাঠি দক্ষ কতৃর্পক্ষের ওপর নির্ভর করে। সার্বিক বিষয়ে সমৃদ্ধ তথ্য ও আকর্ষণীয় রূপ নিয়ে ‘দৈনিক খুলনা গেজেট’ পত্রিকা সকল শ্রেনীর পাঠকের চাহিদা ও আন্তরিক ইচ্ছা পূরণ করবে বলে আমি আশাবাদ ব্যক্ত করছি। এই আশার সঠিক বাস্তবায়নই হবে সকল শ্রেনীর পাঠক ও পত্রিকা প্রেমীদের মূল লক্ষ্য।
লেখক : শিক্ষাবিদ, কবি ও প্রবন্ধকার।
খুলনা গেজেট/এএজে