১৯৮৯ সালে বানরগাতি এলাকায় অবস্থিত খুলনা অঞ্চলের সবচাইতে বৃহত্তম বেসরকারি কলেজে আমি জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করি। তখন কলেজটির অধ্যক্ষ ছিলেন খুলনার ডাকসাইটে অধ্যক্ষ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ মাজহারুল হান্নান। তার আমলে সে সময় কলেজটির এই অর্থে বেশ সুনাম ছিল যে কলেজটি বেশ শক্ত হাতে প্রশাসন চালাতো। কোন ধরনের দুর্নীতি বা দুর্নাম করার কোন সুযোগ ছিলোনা। পরীক্ষার হলে নকল হতো না, অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগ হতো না, ক্লাসে শিক্ষকগণ নিয়মিত ঘড়ি ধরে আসতেন, গাইড সিস্টেমে শিক্ষকগণ পড়াতেন এবং অভিভাবক পর্যন্ত পৌছাতেন। উপরন্তু পরীক্ষার মান উন্নয়নে বহুবিধ প্রচেষ্টাও অব্যাহত ছিল। সেমিনার, ওয়ার্কশপ, সহপাঠ শিক্ষা, ব্যতিক্রমধর্মী সাংস্কৃতিক সপ্তাহের আয়োজন প্রভৃতি। অবশ্য এত কিছু করা সত্ত্বেও কলেজটির আর্থিক স্বচ্ছলতার বড় অভাব ছিল।
শিক্ষার্থী ভর্তি হতে না চাওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে বলা যায় অভিভাবকগণ যত না নকলমুক্ত শিক্ষাঙ্গন দেখতে চাইতেন তার চাইতেও বেশি চাইতেন এ প্লাস রেজাল্ট। তা সে যেভাবেই হোক। অনেকটা দেশের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব থাক বা না থাক ব্যাঙ্ক ব্যালান্স আকাশ ছোঁয়া হলেই হল। আমাদের জাতিগত এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বাঙালির জাতীয় নেতা শহীদ সোহরাওয়াদীর নামে কলেজটি হলেও তৎকালীন সময়ে কলেজটির কোন উন্নয়ন হয়নি। বরঞ্চ পরবর্তীতে প্রচন্ড দলীয়করণের কারণে মুখ বলা যেটুকু সুনাম ছিল তাও বানের পানিতে ভেসে গেছে। কেবল মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থেকেছে সরকারি অনুদানের দুই একটি উঁচু উঁচু ভবন। বহুকাল ধরেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রশাসক, এলাকাবাসী, বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাঙ্গনের নিয়ন্ত্রকরা চেয়েছেন ভুয়া শিক্ষা ব্যবস্থা, অদক্ষ ও মেরুদন্ডহীন প্রজন্ম, নাগরিকদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং জাতীয়ভাবে নির্লজ্জ পরাজয়। একজন আদর্শ শিক্ষক এই পরিবেশে কিভাবে কাল কাটিয়েছেন কেউ কখনো ভেবেও দেখেননি।
সব সময় ব্যবহারিক পরীক্ষায় বাধ্যতামূলকভাবে ২৫ এর মধ্যে ২৫ আদায়ের নগ্নতা, অবাধ নকলসহ বহুবিধ অন্যায় আবদার সব শিক্ষকদের কি ভালো লাগে? ভাল লাগে কোচিং সেন্টার নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার মুখস্থ তোতাপাখি নির্মাণ পদ্ধতি? না সব শিক্ষকদের ভালো লাগেনা। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের প্রকৃত শিক্ষার কারিগর, সেই তাদের কথা বলছি। না, তাদের ভালো লাগেনা। তাদের ভাল লাগার কথা কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছে? সারাটা জীবন তারা নিঃশব্দে আদর্শ শিক্ষার্থী নির্মাণ করার ব্রতে জীবন কাটিয়ে গেলেন। জাতিকে দিয়ে যেতে চাইলেন জীবনের অমূল্য অহংকার “আমি শিক্ষক, আমি জাতির মেরুদন্ড নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কারিগর।”
কেউ কিছু দিল কি না দিল সেটি বড় কথা নয়। শিক্ষাঙ্গনে আদর্শ রেখে যাওয়াটাই বড় কথা। কিছু শিক্ষক যে এখনো এমন করে ভাবে এটা কি প্রমাণ করা যেত যদি না মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের মেহেরীন- মাসুকা সহ সকলের অবিস্মরণীয় এই অবদান জাতির সামনে না আসতো। তারা তো সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, ছোট্ট ছোট্ট ফুলের সমারোহে সাজানো বাগান আগুনের লেলিহান শিখায় ভষ্মিভূত হয়ে গেছে। এমনকি তরুণ পাইলট তৌকিরের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর হাতের মেহেদির রঙও পুড়ে গেছে, সেই দাদুটা যে নাতির জন্য টিফিন দিতে এসে অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুর সময় বলে গেছে আমার নাতিকে টিফিনটা পৌঁছে দিও। সেই ছোট্ট বন্ধু যে সেনাবাহিনীর নিষেধকে অগ্রাহ্য করে দৌড়ে চলে গেছে তার অগ্নিদগ্ধ ছোট্ট বন্ধুটির কাছে। শুনতে পেয়েছে অপেক্ষমান জ¦লন্ত দেহ নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া বন্ধুটির শেষ সংলাপ ‘বন্ধু আমি জানতাম তুমি আসবে’।
আমরা কি জানতাম ক্রমশ হতাশার পুঞ্জিভূত বেদনার মধ্যে এভাবে আশার সঞ্চার হবে? আমরা মহান আল্লাাহ পাকের সেই অমৃত বাণীকে স্মরণ করতে পারব “তোমরা আমার উপর নিরাশ হয়ো না” আমরা কি সত্যি আশার কথা ভাববো? মনের মধ্যে আশঙ্কা গুমরে ওঠে। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন, নাইমা প্রমুখদের কণ্ঠস্বরের আর্তনাদ শুনতে পাই। অন্ধ, আহত, পঙ্গু জুলাই-আগস্ট এর সব বীর যোদ্ধাদের যন্ত্রণাদগ্ধ গোঙ্গানির শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। ছটফট করতে থাকেন জুলাই আগস্ট এর সেই বিপ্লবী শিক্ষক শিক্ষিকারা যারা প্রাণের টানে, পিতার দায়িত্ববোধে, মায়ের মমতায় এই শিক্ষার্থীদের কাছে ছুটে চলে এসেছিলেন। ভোলা কি যায়? সেই শিক্ষার্থীর কথা যে, অনেক পুলিশ বেষ্টিত অবস্থায় চিৎকার করে বলেছিল “আঙ্কেল আঙ্কেল আমাকে ছেড়ে দিন আমি কিছু করিনি”।
শিক্ষক শিক্ষিকাদের সেই অবিস্মরণীয় ভূমিকার কথা কি জাতি মনে রেখেছে? কই তাদের তো আর দেখি না। গুটিকয়েক সুবিধাভোগী শিক্ষক স্বার্থের ঝোলা কাঁধে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছেন। এরা তো তারা নয়, যারা অলৌকিক সময়ে অলৌকিকভাবে দায়িত্ব পালন করে আবার অন্তরালে চলে গেছেন। তাদের কথা কি এভাবেই ইতিহাস থেকে মুছে যাবে? হারিয়ে যাবে তাদের অপরিশোধযোগ্য অবদান? জনতা কি আবারো গতানুগতিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে? নাকি হৃদয়ের মাটির ভিতরে ভিতরে রয়ে যাবে পোড়া বীজ, নীরব অঙ্গীকার।
মনে পড়ে এক সাদা শাড়ি পরিহিত প্রবীণ শিক্ষিকাকে। পুলিশ বেষ্টিত শিক্ষার্থীদের বুকের মধ্যে আগলে ধরে রাস্তার উপর পুলিশদের সঙ্গে সমানে চিৎকার করছেন। বলছেন “ওদের গায়ে হাত দেবেন না আমার সঙ্গে কথা বলেন”। সেই শিক্ষিকাকে কি ভোলা যায়? সেতো জাতিকে অনুপ্রাণিত করে। সেই ছাত্রীরা আমাদের বুক ভরিয়ে দেয়, যারা তাদের সহপাঠীদের পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জীবন বাজি রেখে রাস্তায়, অফিসে, বাড়ির গলিতে, ভয়ার্ত জনপদে লড়াই করেছে। বুক পেতে দিয়েছে ছাত্রদের বাঁচানোর জন্য। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, জনতা মিলেমিশে একাকারের যে চিত্র আমাদের জাতিকে জাগিয়ে তুলেছে, সেইখানে দাড়িয়ে মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের পুড়ে যাওয়া ভগ্নস্তুপ আমাদের শক্তি যোগায়। আমাদের প্রচন্ডভাবে অহংকারী করে তোলে।
আমরা বলতে পারি, সব শিক্ষকরাই কোচিং সেন্টার নির্ভর নয়, সবাই স্বার্থের জন্য আদর্শ বিক্রি করে না। শিক্ষার্থীদের আগুনের মাঝে ফেলে পালিয়ে যায় না। নিজের গায়ে আগুন নিয়ে, নিজের সন্তানের কথা না ভেবে অকাতরে প্রাণ দিয়ে যায়। আজ তাই বাংলাদেশের নিরব হয়ে থাকা নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকরা প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতে পারেন, যে তারা জাতির মেরুদন্ড নির্মাণে নিভৃতে কাজ করে। বিশেষ করে বেসরকারী বহু শিক্ষক ঠিকমতো বেতন পান না, বৈষম্যের শিকারে তারা লজ্জিত জীবন যাপন করেন কিন্তু প্রাপ্য সম্মান ভাগ্যে জোটে না।
আমি অবসরে গেছি ২০২২ সালে। কল্যাণ তহবিল আমারই গচ্ছিত টাকায় গঠিত। শূন্য হাতে কলেজ থেকে বেরিয়ে এসেছি তাও প্রায় তিন বছরের কাছাকাছি। শুনেছি অবসরের ডিজি পলাতক এবং বিশ হাজার কোটি টাকা লুটপাট। জানিনা সত্যি কিনা। ২০২৭ সালের আগে খোঁজ নেওয়াই নাকি যাবে না। সারাজীবন সততার সাথে শিক্ষকতা করার চেষ্টা করেছি। কলেজের ৫০ বছর পূর্তির কনভেনারের দায়িত্ব পালন করে প্রশাসনিক ও সহকর্মীদের প্রচন্ড ভালবাসা এবং শ্রদ্ধাসহ ঘরে ফিরেছি কিন্তু জাতির কাছ থেকে আমার কি কিছুই প্রাপ্তি ছিল না? জীবনের শেষ সায়াহ্ণে তবে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো?
লেখক : কথা সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
খুলনা গেজেট/এএজে