Edit Content
খুলনা, বাংলাদেশ
শনিবার । ৩০শে আগস্ট, ২০২৫ । ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩২
Edit Content

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: স্বপ্ন, আত্মত্যাগ ও নবযাত্রার এক বছর

প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ এবং আহতদের প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের পক্ষ থেকে সম্মান ও গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। ২০২৪ সালের ‘জুলাই মাস’ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে চাপা পড়া জনঅসন্তোষ, বঞ্চনা, সামাজিক বৈষম্য ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক প্রতিবাদ। যে প্রতিবাদের নেতৃত্ব দেয় মূলত দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজ, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই অভ্যুত্থান শুধু একটি নির্দিষ্ট দাবি আদায়ের আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর গভীর অসঙ্গতির বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত সামাজিক প্রতিরোধের নাম। এই প্রতিরোধ- আন্দোলন, যা ইতিহাসে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ বা ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে খ্যাত, শুধুমাত্র সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং একটি ন্যায্য, মানবিক ও জবাবদিহিতার রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় থেকে উৎসারিত।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সমাজ- অর্থনীতি ও রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে একটি অসমতা ও বৈষম্যের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যপূর্ণ কোটাব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের পক্ষপাতমূলক বণ্টন, প্রশাসনে দলীয়করণ, গণতান্ত্রিক চর্চার সংকোচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা- এই সব কিছু মিলিয়ে দেশে এক অস্থির সামাজিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল। এসব অসঙ্গতির বিরুদ্ধে অনেক আগে থেকেই ক্ষোভ জমছিল সাধারণ মানুষের মনে, বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে।

এই জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুন মাসে, যখন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ সরকারি চাকরিতে কোটা সংক্রান্ত এক পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে। সেই রায়ের পর শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে সংগঠিত হয়ে সারাদেশে বিক্ষোভ শুরু করে। এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তারা শুধু একটি রায় বাস্তবায়নের দাবি তোলে না, বরং রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বৈষম্যের অবসান চায়। শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করে যে, কোটার সংস্কার একটি প্রতীক মাত্র, আসলে এটি বৃহৎ এক রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের প্রাথমিক ধাপ।

এই আন্দোলনের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিকেন্দ্রীভবন ও নেতৃত্বের বিকল্প মডেল। শুরু থেকেই আন্দোলনের নির্দিষ্ট কোনো মুখপাত্র ছিল না। বরং সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মনোনীত ৬৫ সদস্যের সমন্বয় কমিটি আন্দোলনকে পরিচালনা করে, যার মধ্যে ২৩ জন ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক। এটি ছিল এক অভূতপূর্ব সাংগঠনিক রূপ।
১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ এবং ১৮ জুলাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ডিসিপ্লিনের ’১৯ ব্যাচের মেধাবী ছাত্র মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ- এর আত্মত্যাগ আন্দোলনকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাদের সাহসিকতা এবং জীবনদান গোটা জাতিকে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে টেনে আনে।

সেইদিন থেকে আন্দোলন আর কেবল শিক্ষার্থীদের ছিল না, এটি হয়ে ওঠে একটি জাতীয় অভ্যুত্থান। সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী শ্রেণি, চাকরিপ্রার্থী যুবক- যুবতী এবং সমাজের নানা স্তরের নাগরিকরা এতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন।

এই পর্যায়ে আন্দোলনের ভাষা, কৌশল ও কৌশলগত অবস্থান আরও সুসংগঠিত হয়। প্রতিবাদের পাশাপাশি উপস্থাপন করা হয় বিকল্প চিন্তাধারা, একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কাঠামোর প্রস্তাবনা। ১ আগস্ট দেশজুড়ে জনতার এক অপূর্ব সংহতি দেখা যায়। এর ফলে সরকারের ভিত কেঁপে ওঠে। প্রতিরোধের মুখে তৎকালীন সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং ৫ আগস্ট তার পতন ঘটে। আন্দোলনকারীরা এই দিনটিকে আখ্যা দেন ‘৩৬ জুলাই’ নামে, যা কেবল প্রতীকি নয়, বরং একটি দার্শনিক অবস্থানঃ সময়কে তারা নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে নিজেদের সংগ্রামের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চেয়েছেন।
এই রাজনৈতিক পালাবদলের পর নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যার অগ্রাধিকারে ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং তরুণ সমাজের স্বপ্ন পূরণের নীতিনির্ধারণ।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে আন্তর্জাতিক মহলে আরব বসন্তের আলোকে ‘বাংলা বসন্ত’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রশংসা করেছে। দেশের ভাবমূর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুন গতিপথে প্রবেশ করেছে।

আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবৃতি, সমর্থন ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিবিসি, আল জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ানসহ অনেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অনেক সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানায়। অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন একাত্মতা জানিয়ে কর্মসূচি পালন করে, যা প্রমাণ করে এটি ছিল এক বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণকারী জনতার বিপ্লব।

এই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হওয়া, বার্তা প্রচার, তথ্য যাচাই ও সহিংসতা ডকুমেন্ট করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের ভাষাকে আধুনিক ও গতিশীল রূপ দেয়। তারা প্রমাণ করেছে- নেতৃত্ব কেবল রাজনৈতিক দলে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সচেতন নাগরিকরাই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক।
এই অভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ছাত্রীরা যেমন নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি নারীকর্মী, শিক্ষক, লেখকসহ সর্বস্তরের নারীরা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। নারীদের সক্রিয় ভূমিকা, প্রতিরোধে অংশগ্রহণ, সমাবেশে নেতৃত্ব, সামাজিক মাধ্যমে সোচ্চার উপস্থিতি সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছিল এক বহুমাত্রিক গণআন্দোলন। নারীর অধিকার ও সমতা নিয়েও বিভিন্ন সময় আলোচনার জন্ম দেয় এই আন্দোলন, যা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন এক ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার জন্ম দিয়েছে। শুধু রাজনীতি নয়, শিল্প, সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও সংগীতেও এর প্রভাব পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে কবিতা, পোস্টার আর গ্রাফিতির মাধ্যমে নতুন এক ভাষা রচিত হয়েছে। অনেক তরুণ লেখক ও গবেষক এই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গবেষণাকর্ম, প্রতিবেদন ও স্মৃতিকথা প্রকাশ করছেন। এটি প্রমাণ করে এই আন্দোলন শুধুই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ।

যে স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সূচনা হয়েছে, তার বাস্তবায়ন একটি ধারাবাহিক ও দায়িত্বশীল যাত্রার দাবি রাখে। এখনও দেশের বিভিন্ন খাতে জড়িত রয়েছে পুরনো ধাঁচের প্রভাব, অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত দ্বিধা। আইনি সংস্কার, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, শিক্ষার আধুনিকায়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা দরকার। তরুণদের অংশগ্রহণ কেবল আন্দোলনে নয়, এখন নীতিনির্ধারণ, গবেষণা ও ভবিষ্যতের নেতৃত্বেও প্রয়োজন। সুশাসনের ভিত রচনায় শিক্ষক, প্রশাসক, জনপ্রতিনিধি, মিডিয়া ও নাগরিক সমাজকে একত্রে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

২০২৪ সালের জুলাই মাস কেবল একটি অভ্যুত্থানের প্রতীক নয় এটি ছিল এক নবজাগরণের সূচনা। এটি আমাদের শিখিয়েছে পরিবর্তন সম্ভব, যদি জনতা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং তরুণরা স্বপ্ন দেখতে শেখে। তবে এই নবযাত্রার পথ সহজ নয়। এটি দীর্ঘ, চ্যালেঞ্জপূর্ণ এবং অবিরাম প্রয়াসের দাবি রাখে। জুলাই- ২৪ কেবল একটি আন্দোলনের ফসল নয়, এটি একটি সভ্যতা গঠনের সূচনা। এই সূচনালগ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশই পারে নবযাত্রার বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে।

লেখক : উপাচার্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন