A newspaper is the history of today, and a prophech of tomorrow’ সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ এবং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। কারণ এটি সমাজের ঘটে যাওয়া ঘটনা, সমস্যা এবং মানুষের চাওয়া-পাওয়া সকলের কাছে পৌঁছে দেয়। একটি ভালো দৈনিক সমাজের অগ্রগতি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দৈনিক সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন, স্থানীয় খবর এবং বিভিন্ন ধরনের মতামত ও বিশ্লেষণ। এছাড়াও সম্পাদকীয় পাতা, ফিচার বিভাগ এবং বিজ্ঞাপনের মতো উপাদানগুলিও সংবাদপত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
খুলনার অন্যতম নিউজ পোর্টাল ‘খুলনা গেজেট’ পঞ্চম বছর পূর্ণ করে ষষ্ঠ বছরে পদার্পণ করল। অভিনন্দন জানাই ‘খুলনা গেজেট’কে। অভিনন্দন এই নিউজ পোর্টালের সকল সফল কারিগরদেরকে। যাদের নিরলস পরিশ্রম ও ত্যাগে আজ পত্রিকাটি মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। কারণ একটা নিউজ পোর্টাল পাঁচ বছর চলমান রেখে জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করা নিঃসন্দেহে একটা বড় অর্জন। সেই বাস্তবতায় নিউজ পোর্টালটি জনগণের আস্থা ও ভালোবাসা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, এটি বড় বিষয়।
সংবাদপত্র গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সংবাদপত্র একান্ত অপরিহার্য। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামত, চাহিদা ও সমস্যাগুলি সরকারের কাছে পৌঁছানো এবং সরকারের কার্যকলাপ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা এই দুই দিকেই সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। যা জনগণের কণ্ঠস্বর এবং সরকারের জবাদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সে বিবেচনায় ‘খুলনা গেজেট’ গত পাঁচ বছরে সংবাদ পরিবেশনে দক্ষ নাবিকের ভূমিকায় ছিল, সেটি বলা যায়।
খুলনা গেজেট গত পাঁচ বছরে স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা, উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের উপর গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, রাজনৈতিক ঘটনা এবং সামাজিক সমস্যা নিয়ে তারা কাজ করেছে। স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা, যেমন- রাস্তা মেরামত, জলাবদ্ধতা, নদী ভাঙন, ইত্যাদি ইস্যুগুলো এড়িয়ে যায়নি নিউজ পোর্টালটি।
”সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামত, চাহিদা ও সমস্যাগুলি সরকারের কাছে পৌঁছানো এবং সরকারের কার্যকলাপ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা এই দুই দিকেই সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। যা জনগণের কণ্ঠস্বর এবং সরকারের জবাদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সে বিবেচনায় ‘খুলনা গেজেট’ গত পাঁচ বছরে সংবাদ পরিবেশনে দক্ষ নাবিকের ভূমিকায় ছিল, সেটি বলা যায়।”
এছাড়া ‘খুলনা গেজেট’ স্থানীয় রাজনৈতিক ঘটনা, নির্বাচন, সভা-সমাবেশ এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন- বাল্যবিবাহ, মাদক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। ২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ‘খুলনা গেজেট’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নানা সময়ে ‘খুলনা গেজেট’ আবহাওয়া ও জলবায়ু, সুন্দরবন নিয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পরিবেশন করেছে- যা দেশ ও আন্তজার্তিক পরিমন্ডলে সমাদৃত হয়েছে। ইতোমধ্যে খুলনা গেজেট গত পাঁচ বছরে বাংলদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
একটি মুদ্রিত সংবাদপত্রের কাছে পাঠকের বেশ কয়েকটি প্রত্যাশা থাকতে পারে :
প্রথমত, সংবাদপত্রের কাছে বস্তুনিষ্ঠ, নির্ভুল এবং পক্ষপাতহীন সংবাদ পরিবেশনের আশা করা হয়।
দ্বিতীয়ত, সংবাদপত্রের উচিত সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা এবং তাদের সমস্যা ও উদ্বেগের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
তৃতীয়ত, সংবাদপত্রকে সমাজের সমস্যা সমাধানে গঠনমূলক আলোচনা ও বিতর্কের জন্য একটি প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে হবে।
একজন নাগরিক হিসেবে মুদ্রিত সংবাদপত্রের কাছে নিম্নলিখিত প্রত্যাশা থাকতে পারে :
বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভুল সংবাদ : সংবাদপত্রকে সমাজের ঘটে যাওয়া ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভুল চিত্র তুলে ধরতে হবে। কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব বা ব্যক্তিগত এজেন্ডা ছাড়াই সত্য ঘটনা প্রকাশ করতে হবে।
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন : সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের মতামত, দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে হবে। শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মতামতকে গ্রহণ না করে, সকলের কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে।
গঠনমূলক সমালোচনা ও বিতক : সংবাদপত্রকে সমাজের বিভিন্ন সমস্যা ও অসঙ্গতি তুলে ধরতে হবে এবং এগুলোর সমাধানে গঠনমূলক সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি করতে হবে।
সততা ও স্বচ্ছতা : সংবাদপত্রের কর্মীরা তাদের কাজের ক্ষেত্রে সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখবে, এমন আশা করা হয়।
জনস্বার্থ রক্ষা : সংবাদপত্রকে সবসময় জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং কোনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ হাসিলের জন্য কাজ করা উচিত নয়।
দায়বদ্ধতা : সংবাদপত্র তাদের প্রকাশিত সংবাদের জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে এবং কোনো ভুল হলে তার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিবে।
শিক্ষামূলক ও জ্ঞানবৃদ্ধিকারী কন্টেন্ট : সংবাদপত্রকে শিক্ষামূলক ও জ্ঞান বৃদ্ধিকারী কন্টেন্ট প্রকাশ করতে হবে, যা সমাজের মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রচার : সংবাদপত্রকে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রচার করতে হবে এবং এগুলোর সংরক্ষণে কাজ করতে হবে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা : সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরতে পারে।
ফ্যাক্টচেকিং ও অপতথ্য মোকাবেলা : সমাজে অপতথ্য ও ভুয়া তথ্য প্রচার রোধে সংবাদপত্রকে ফ্যাক্টচেকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা : সাংবাদিকেদের কাজের পরিবেশ সুরক্ষিত করতে হবে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
উপরিউক্ত বিষয়গুলো সঠিকভাবে পালন করতে পারলে একটি পত্রিকা সত্যিকারের গণ-কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে। ‘খুলনা গেজেট’ এর কাছে আমাদের এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করি।
সংবাদপত্র কেবল মুক্ত নয়, এটি শক্তিশালী। সত্যিই একটি সংবাদপত্র আজকের ইতিহাস এবং আগামীকালের ভবিষ্যদ্বাণী। খুলনা গেজেট গত পাঁচ বছর প্রতিটা সংবাদ অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও সাহসের সঙ্গে পরিবেশন করেছে।‘ খুলনা গেজেট’ এর সংবাদগুলো দেখলে সেটি সহজেই বলা যায়। আগামী সময়গুলোতে সে চেষ্টাকে অব্যাহত রেখে পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাবে সে প্রত্যাশা করি। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে দিয়ে জনগণের আশা আকাঙ্খা পূরণ হবে সেটা আশা করি।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সামাজিক বাস্তবতা অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। আজকের সমাজকাঠামো অনেকটা জটিল। সহজ সমীকরণের মধ্য দিয়ে মানুষের গুণগত চাহিদাকে পরিমাপ করার জন্য সংবাদপত্র একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। যদিও সংবাদ পরিবেশনের অনেক মাধ্যম এখন রয়েছে, তবে মুদ্রিত সংস্করণের চাহিদা কখনও পূরণ হবার নয়। মার্কসীয় দর্শনে সমাজের ভিত্তিভূমি অনেকটা মৌলভিত্তি বা মৌল কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে রচনা করা হয়। উপরিকাঠামো সহায়ক ভূমিকা হিসেবে পালন করে থাকে। তবে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের উভয় ক্ষেত্রে (মৌলকাঠোমো, উপরিকাঠামো) সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে থাকে।
সর্বশেষ, একটি সংবাদপত্রের কাছে জনগণের প্রত্যাশা হলো বস্তুনিষ্ঠ, নির্ভুল এবং সময়োপযোগী তথ্য সরবরাহ করা, যা জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে এবং তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সংবাদপত্রের নতুন দিগন্তে ‘খুলনা গেজেট’ এর মুদ্রিত সংস্করণের স্থায়িত্ব, সফলতা ও বহুল প্রচার কামনা করি।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
খুলনা গেজেট/এএজে