বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক মাইলফলক। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। ২০২৪ সালের ১ জুলাই এ আন্দোলন শুরু হয়। প্রথমে এটি কোটা সংস্কার ও পরবর্তীকালে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাই অভ্যুত্থানকে ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করেছে খ্যাতনামা ব্রিটিশ পত্রিকা ঞযব The Economist|। এই ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাস এমন করে বদলে দিয়েছে, যার নজির একাত্তরের পরে আর দ্বিতীয়টি নেই। বাহান্ন থেকে এদেশে পর পর যেসব আন্দোলন ঘটেছে তার মধ্যে জুলাই আন্দোলন সব থেকে ব্যাপক, গভীর এবং শাসকদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রভাব তো রয়েছেই, গণমানুষের মনোজগতে, চিন্তা ও সৃজনশীলতায় গভীর অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের সাথে গ্রাফিতিও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। মূলত দেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পর গ্রাফিতি অঙ্কনের ব্যাপকতা শুরু হয়। গণঅভ্যূত্থানের পর নানা রকম গ্রাফিতিতে ভরে ওঠে শহরের প্রায় প্রতিটি দেওয়াল। আন্দোলনের চেতনা, দাবি এবং প্রতিবাদের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এসব গ্রাফিতি। জুলাই-অভ্যুত্থানে দেওয়ালের গ্রাফিতি ব্যক্তির চিন্তার জগতে নিঃসন্দেহে বড় প্রভাব ফেলেছে।
মূলত জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সরকারের নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং আন্দোলনের বার্তা দ্রুত জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। এ উদ্দেশ্যে দেশের সকল শহরের দেওয়াল জুড়ে আঁকা হয়েছে আন্দোলনের উজ্জীবনী গ্রাফিতি। এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। একে স্মরণীয় করে রাখতেই শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ। গ্রাফিতিতে চিত্রিত তাদের রক্তের দাগ, বৈষম্যবিরোধী প্রতিবাদ, অভ্যুত্থানের দৃশ্য, রাষ্ট্র সংস্কার, বদলে যাওয়া বাংলাদেশের গল্প, অসাম্প্রদায়িক বাংলার রূপ, দুর্নীতি-দু:শাসনের অবসান, বাক স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, নব প্রজন্মের প্রত্যাশাসহ আরও অনেক বিষয়। শিক্ষার্থীদের আঁকা শিল্পকর্ম গণমানুষের নজর কাড়ে এবং সবারই প্রশংসা পায়। ‘রক্তাক্ত জুলাই’কে ছাত্র-জনতা গ্রাফিতিতে জীবন্ত রূপ দান করেছে। ফলে গ্রাফিতিগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতিগুলো জনসচেতনতা গঠনে এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করতে ভিজ্যুয়াল কালচারের এক রূপান্তরিত শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, যা বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের হাতিয়ার ও শিল্প হিসেবে গ্রাফিতিকে দিয়েছে নতুন এক মাত্রা।
”রক্তাক্ত জুলাইকে ছাত্র-জনতা গ্রাফিতিতে জীবন্ত রূপ দান করেছে। ফলে গ্রাফিতিগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতিগুলো জনসচেতনতা গঠনে এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ আন্দোলনকে উদ্দীপিত করতে ভিজ্যুয়াল কালচারের এক রূপান্তরিত শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, যা বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের হাতিয়ার ও শিল্প হিসেবে গ্রাফিতিকে দিয়েছে নতুন এক মাত্রা।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আলোচিত বিষয়গুলোর অন্যতম গ্রাফিতি। গণ-আন্দোলনের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন বিষয়ক চিত্রপ্রদর্শনী করেছে। পরে সেসব নিয়ে দেশে-বিদেশে একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো The Art of Triumph, মুক্ত করো ভয়; জেগেছে বাংলাদেশ; Odes to a Bangladesh Reborn, July Uprising: Satire and Ridicule, Graffiti Of Revolution: Bangladesh 2024- the study of Mass uprising Through Art, অরুণ প্রাতের তরুণ দল; সংগ্রামের শত রঙ; গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে ইত্যাদি।
এছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগ বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও বই, ডকুমেন্টারি, প্রতিবেদন ও অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশে জুলাই এর গণঅভ্যুত্থান, ৩৬ জুলাই: জনতার বিজয়, ফ্যাসিবাদের পতন- অনেক প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে আন্দোলনের চিন্তা চেতনা ধারণ করে। আন্দোলনে আইকনিক শহীদ আবু সাঈদের ছবি আঁকেন ভারতের অঙ্কন শিল্পী কৌশিক সরকার। অনেকে পোস্টার একেঁছেন। গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা নিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ সমকালকে অতিক্রম করে ইতিহাসের উপাদান হয়ে উঠেছে।
গ্রাফিতিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের আদ্যোপান্ত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পক্ষ থেকে ২৯ জুলাই ২০২৪ প্রথম সারাদেশে গ্রাফিতি কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্রাফিতির কাজ শুরু করে। নিজেরা চাঁদা তুলে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ক্যালিগ্রাফিতে করা এসব গ্রাফিতি শহরের সড়কে এনেছে নান্দনিকতা। ‘রক্তাক্ত জুলাই’ তারা গ্রাফিতিতে তুলে এনেছে।
জুলাই আন্দোলনে সমগ্র বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল আনাড়ি নাম না জানা শিল্পীদের উন্মুক্ত ক্যানভাস। হাজার-হাজার গ্রাফিতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে জনতার ক্ষোভ, আশা, চিন্তা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সুষ্ঠু সংস্কারের প্রত্যাশা। ছবিতে স্লোগানে গ্রাফিতিগুলো যেনো সরাসরি রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করছে, সমাজের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে, রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোয় পরিবর্তনের সঞ্চার ঘটাচ্ছে। রঙের মাধ্যমে, শব্দের মাধ্যমে, প্রতীকের মাধ্যমে গড়েছে এক নতুন চিন্তার পরিসর। গ্রাফিতিগুলোর সরাসরি কিংবা সাংকেতিক উপস্থাপনা লক্ষ করলে উপলব্ধ হয়- সাধারণ জনগণ বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা এই গ্রাফিতিগুলোতে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের বিপরীত অবস্থান তুলে ধরেছে, একইসঙ্গে স্বৈরাচারকে প্রতিরোধের জন্য সম্মিলিত আকক্সক্ষা এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। দেওয়াল জুড়ে প্রতিবাদ, দেশপ্রেম, সাম্য ও ভাতৃত্বের বন্ধন। গ্রাফিতিগুলোর বক্তব্যে প্রধানত ধরা পড়ে তাদের স্বপ্ন ও রাষ্ট্র-সমাজ পরিবর্তনেরই আকাঙক্ষা। পাশাপাশি আছে তীব্র স্বৈরাচারবিরোধী আবেগ-অনুভূতি। আছে স্বাধীনতা-স্বাধিকারের অনুভূতি। এসব গ্রাফিতিতে মুলত অভ্যূত্থানে প্রাণ হারানো ছাত্র-জনতার প্রতিকৃতি ও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধার পাশাপাশি উঠে এসেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, সমাজের-রাষ্ট্রের সংস্কারের দাবি, দুর্নীতি বন্ধ করা, স্বৈরতন্ত্রের অবসান, অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাক-স্বাধীনতার অভাব, সম-অধিকার থেকে শুরু করে সব রকমের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আর প্রতিরোধের অগ্নিময় উক্তি। এসেছে বহু কালজয়ী গান ও কবিতার পঙ্ক্তি। আছে নবীনদের নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের কথাও। জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতিগুলো অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে যে বিষয়গুলো নজরে আসে, তা হলো কর্মক্ষেত্রে কোটা বৈষম্যের প্রতিবাদ, মুক্তিযুদ্ধের অপব্যাখ্যার প্রতিবাদ, লড়াইয়ে টিকে থাকার অনুপ্রেরণা, আন্দোলন-স্লোগান, জনতার অধিকার, বিভাজনের অপকৌশলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও ধর্ম, গান ও কবিতা, প্রতীকী প্রতিবাদ, হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নির্যাতন-নিপীড়ন বিরোধী প্রতিবাদ, জুলাই ক্যালেন্ডার, পোস্টারের মাধ্যমে প্রতিবাদ, কথামালার পরিবর্তে আলোচিত ছবি ইত্যাদি।
জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতির মূল লক্ষ্য ছিল সরকারের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং আন্দোলনের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া। বিশেষ করে সরকার বিরোধী বার্তার জন্য গ্রাফিতির মাধ্যমে শহরের দেওয়ালগুলো ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। দেওয়ালে আঁকা প্রতিটি চিত্র এবং শ্লোগান জনগণকে ভাবতে বাধ্য করেছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি।
জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন সমাজের আশা প্রকাশ করেছে, যা ছিল বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের প্রাথমিক প্রতিফলন। সম্মিলিত ক্ষোভ ও প্রত্যাশা প্রকাশে গ্রাফিতি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। গ্রাফিতিগুলোতে ভাষা ও প্রতীকের মাধ্যমে স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার এক সুস্পষ্ট দাবি উত্থাপিত হয়েছে, যা নিপীড়ন, বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদী শাসন প্রত্যাখ্যানের প্রকটতাকে তুলে ধরেছে। জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতিগুলো জনসচেতনতা গঠনে এবং সম্মিলিত প্রতিরোধ আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করতে ভিজ্যুয়াল কালচারের এক রূপান্তরিত শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে, যা বাংলাদেশ তথা বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের হাতিয়ার ও শিল্প হিসেবে গ্রাফিতিকে দিয়েছে নতুন এক মাত্রা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে দেশে গ্রাফিতির এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাফিতির প্রভাব এতটাই ছিল; আমরা দেখেছি এ নিয়ে অন্তবর্তী সরকার একটি সংকলন করতে বাধ্য হয়; এবং সেটি জাতিসংঘের অধিবেশনে যাওয়ার সময় সঙ্গী করে, সেটি বিশ্বনেতাদের হাতেও তুলে দেয়। গ্রাফিতি জুলাই বিপ্লবে অগ্রণী সৈনিকের ভূমিকা পালন করেছে এ কথা অবধারিত। যুগে যুগে গ্রাফিতি সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামকে বেগবান করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম অনুসঙ্গ গ্রাফিতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক মাত্রাসহ আরও নানা বিষয়। জুলাই আন্দোলনে ও আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেয়ালের গ্রাফিতি ও কথামালা মানুষের চিন্তার জগতে বৈপ্লবিক পরিবতর্ন এনেছে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রশংসনীয় গ্রাফিতি ও কথামালা এখন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজবিজ্ঞান, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
খুলনা গেজেট/এএজে