প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, শিশুস্বাস্থ্যের প্রতি সরকার বিশেষভাবে নজর দিয়েছে। শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং কুমিল্লা জেলায় একটি করে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালুর কাজ শুরু হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসে একযোগে এসব পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হবে।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন-২-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য কেবল অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ নয়। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং সময়োপযোগী নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। আজ ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের ভবন-২-এর শুভ উদ্বোধনের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে দেশ আরও এক ধাপ এগিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ যে হাসপাতালের নতুন আরেকটি ভবনের উদ্বোধন হলো, ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর এই হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়া। সময়ের প্রয়োজনে আরও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আজ হাসপাতালটি আকার ও আয়তনে আরও বড় রূপ ধারণ করেছে। এ হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, চিকিৎসক, নার্স, হেলথ টেকনিশিয়ানসহ সবাইকে তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
তিনি বলেন, নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়ুবিক জটিলতা—যেমন স্ট্রোক, ইপিলেপসি বা খিঁচুনি, পারকিনসন্স ডিজিজ, ডিমেনশিয়া কিংবা মেরুদণ্ডের জটিল রোগ—বর্তমানে বিশ্বজুড়ে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক ভবনটি উদ্বোধনের মাধ্যমে এসব রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, সর্বাধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং বিশেষায়িত ওয়ার্ডের সমন্বয়ে গঠিত নতুন ভবনটি কেবল রোগী ভর্তির ধারণক্ষমতাই বাড়াবে না; চিকিৎসা গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
দেশের সাধারণ মানুষ যেন স্বল্প খরচে বিশ্বমানের নিউরোচিকিৎসা পেতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই ‘নিউরোসায়েন্স-২’ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, অতিরিক্ত বেড এবং দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই ব্যবস্থা দেশের হাজারো রোগীর জন্য আশার আলো বয়ে আনবে।
তিনি বলেন, শুধু প্রযুক্তি থাকলেই একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত হয় না। এর সঙ্গে মানবিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি রোগ শনাক্ত করতে পারে, কিন্তু রোগীর ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক কষ্ট বুঝে তাকে আশ্বস্ত করার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মানবিক আচরণের কোনো বিকল্প নেই। রোগীর প্রতি চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সহানুভূতিশীল আচরণ, মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শোনা, তার মানসিক অবস্থা বোঝা এবং সম্মানজনক আচরণ চিকিৎসাসেবার মান অনেক বাড়িয়ে দেয়।
একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসা পরিবেশ নির্বিঘ্ন রাখতে সব দায়দায়িত্ব চিকিৎসকের একার নয় বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, চিকিৎসক, রোগী এবং রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন—এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও সহানুভূতির সম্পর্ক বজায় থাকা জরুরি। এই তিন পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মানের পরিবর্তে চিকিৎসকরা যদি নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন, কিংবা রোগী ও তার স্বজনরা চিকিৎসকদের ওপর বিশ্বাস ও মর্যাদার সম্পর্ক অনুভব না করেন, তাহলে হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতই করা হোক না কেন, চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ করা যাবে না।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার মনে করে স্বাস্থ্য অধিকার শুধু মৌলিক অধিকারই নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতিরও চাবিকাঠি। স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য ও সবার জন্য সমানভাবে প্রাপ্য হওয়া জরুরি। উন্নত চিকিৎসা যদি শুধু শহরের বিত্তবান মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা বলা যায় না। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক মানুষের কাছেও সাশ্রয়ী ও মানসম্মত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগী যাতে যেকোনো চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে রাজধানীতে আসতে না হয়, সেজন্য সরকার ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। অপরদিকে, বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। ‘সুস্থ আগামী’ বিনির্মাণের লক্ষ্যে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করছে।
তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দিয়ে বর্তমান সরকার প্রমাণ করেছে যে, সরকার ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে চায়—এটি স্রেফ কোনো স্লোগান নয়। বরং সরকার দেশে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যাতে মানুষ দেশের ভেতরেই সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে।
তবে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে সরকার যত উদ্যোগই গ্রহণ করুক না কেন, চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকার ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, সরকার এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে চিকিৎসা পাওয়ার জন্য কোনো নাগরিককে দেশের বাইরে যেতে হবে না কিংবা অর্থের অভাবে কেউ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না। একজন সাধারণ মানুষের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা আপনাদের মাধ্যমেই সম্ভব—এই প্রত্যাশা ও বিশ্বাস রেখে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

