শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যায় তার সহকারীদের ভূমিকা কি ছিল?

গেজেট প্রতিবেদন

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই হত্যাকাণ্ডের পর এ নিয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তবে সেই কমিশনের প্রতিবেদন কখনও জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি হাতে পেয়েছে গণমাধ্যম। কী ছিল ৪৫ বছর আগের সেই প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত প্রকাশ করেছে গণমাধ্যমটি।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর যে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়, তাতে তার ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ইউসুফ মো. মাহফুজুর রহমানের কঠোর সমালোচনা করা হয়। প্রতিবেদনটি জমা দেয়ার আগেই সামরিক আদালতে মাহফুজুর রহমান দোষী সাব্যস্ত হন এবং পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

প্রতিবেদনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমান এবং রাষ্ট্রপতির এইড-ডি-ক্যাম্প (এডিসি) ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের প্রতিও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। মেজর মুজিবুর রহমানকেও ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ফাঁসি দেয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত স্টাফদের একজন বা একাধিক সদস্যের কারণে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল।

ঘটনার রাতে সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানের কক্ষের পূর্ব পাশের একটি কক্ষে অবস্থান করছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান। কমিশনকে দেয়া বক্তব্যে ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক জানান, গুলিবর্ষণ পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পর তিনি রুম থেকে বের হন। এরপর ৪ নম্বর রুমের দিকে অগ্রসর হন, এই রুমেই ছিলেন জিয়াউর রহমান। এসময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুরকে বারান্দার অন্য পাশ থেকে আসতে দেখেন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান ক্যাপ্টেন মাজহারুল হককে জানান যে, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তারা ৪ নম্বর রুমের সামনে রাষ্ট্রপতিকে রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত পড়ে থাকতে দেখেন। তার দেহ বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল এবং খুব কাছ থেকে ছোড়া গুলিতে তার মুখের একাংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

ক্যাপ্টেন মাজহারুল জানান, তারা রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএফএম মইনুল আহসান এবং প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহও দেখতে পান। আহসানের মরদেহ করিডোরে এবং হাফিজ খানের মরদেহ সার্কিট হাউসের প্রথম তলার উত্তর বারান্দার পূর্ব দিকে পড়ে ছিল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অভিযোগ রয়েছে- অভিযানের সময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মইনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজ- তাদের ঘরের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হামলাকারীদের একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজকে লক্ষ্য করে গুলিও চালিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এটা রহস্যই থেকে যাবে যে, কীভাবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ শরীরে একটি আঁচড়ও লাগেনি, অথচ অন্য দুজন কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হয়েছিলেন।

কমিশন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজের ঘরের ভেতরের দেয়ালে গুলির চিহ্নগুলো পরীক্ষা করে, যেগুলো সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে দরজার বাইরে থেকে ছোড়া গুলিতে সেগুলো হয়েছে। কমিশন বলেছে, ওই ঘরটি পরীক্ষা করার সময় আমরা পুলিশের দেয়া কিছু বিশেষজ্ঞ মতামত পেয়েছি। এটা খুবই অসম্ভব বলে মনে হয়েছে যে ওই গুলির চিহ্নগুলো বাইরে থেকে হতে পারে। চিহ্নগুলোর অবস্থান এবং প্রকৃতি এমন যে, এগুলো মনগড়া হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

প্রতিবেদনে পরবর্তীতে উঠে আসে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন মাজহার কেউই তাদের ঘর থেকে বের হননি যতক্ষণ না তাদের দরজায় টোকা দেয়া হয় এবং হত্যাকারীরা চলে যাওয়ার অনেক পরে একজন ওয়্যারলেস অপারেটর তাদের ডেকে বাইরে আনেন।

প্রতিবেদনে উপসংহারে বলা হয়েছে, কমিশন দেখতে পেয়েছে এই দুই সেনা কর্মকর্তা নিজেদের কক্ষের ভেতরে টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে বাইরে আসার কোনো চেষ্টাই করেননি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতির প্রতি তাদের অনুরাগ ও দায়িত্বের কথা বিবেচনা করলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এই আচরণ তাদের সদিচ্ছা ও আন্তরিক আচরণের সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।

ক্যাপ্টেন মাজহারের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, তার কক্ষের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কক্ষের একটি সংযোগকারী দরজা ছিল, কিন্তু গোলাগুলির সময় তিনি সেটি খোলার চেষ্টা করেননি। মাজহার তাদের জানান যে, তিনি রাষ্ট্রপতির কক্ষে টেলিফোন করার চেষ্টা করেছিলেন।

দুটি ঘরের মধ্যে একটি সংযোগকারী দরজা আছে। ঘটনার সময় এডিসি-র পক্ষে ওই দরজা দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছানো বা অন্ততপক্ষে সেই চেষ্টা করাই ছিল সবচেয়ে সহজ উপায়। হত্যাকারীরা যখন রাষ্ট্রপতির ঘরের দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন পালানোর অন্যতম একটি পথ ছিল এডিসি-র ঘরের ভেতর দিয়ে। আশা করা যেত যে, দরজাটি অন্যদিক থেকে আটকানো থাকলেও এডিসি তাতে ধাক্কা দেবেন এবং আসন্ন বিপদে থাকা রাষ্ট্রপতিকে চুপিচুপি নিজের ঘরে ঢুকে পড়ার জন্য অনুরোধ করবেন। রাষ্ট্রপতি হয়তো কিছু সময়ের জন্য হত্যার প্রচেষ্টা এড়াতে পারতেন, যদিও তা চূড়ান্তভাবে সম্ভব হতো না। ওই দরজাটি খোলা থাকলে কী হতো, তা আমরা জানি না। এডিসি-র কাছ থেকে এটা শুনে আমরা অবাক হয়েছি যে, তার ঘর এবং রাষ্ট্রপতির ঘরের মধ্যে যে একটি সংযোগকারী দরজা আছে, সে সম্পর্কে তিনি জানতেনই না, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তারা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজকে সন্দেহ করার আরও কয়েকটি কারণও উল্লেখ করেছেন। প্রমাণে দেখা গেছে যে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ বেশ অস্বাভাবিকভাবে সকালে এনডিসি নাসিরউদ্দিনকে (সার্কিট হাউসের দায়িত্বে থাকা) সার্কিট হাউসের কোন কক্ষে কে থাকছেন, তার তালিকার টাইপ করা কপি সরবরাহ করতে বলেন। কক্ষ বণ্টন এনডিসি দ্বারা করা হয় এবং কক্ষ বিন্যাস দেখানোর জন্য একটি তালিকা কেবল বোর্ডে টাঙিয়ে রাখা হয়, এবং এর কোনো অনুলিপি কাউকে সরবরাহ করার জন্য তিনি বাধ্য নন। আমাদের জানানো হয়েছে যে, এর আগেও যখন রাষ্ট্রপতি সার্কিট হাউসে থেকেছেন, তখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ কখনও কক্ষ বরাদ্দের তালিকা চাননি।

কমিশন আরও তথ্য খুঁজে পেয়েছে। হাউস গার্ডস-ইন-চার্জ ইন্সপেক্টর বাজলুর রশিদ সাক্ষ্য দেন যে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ রাত ১০টায় তাকে রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে মোতায়েন করা দুজন হাউস গার্ডকে এই যুক্তিতে প্রত্যাহার করতে বলেন যে, তারা রাষ্ট্রপতির কাজে বিঘ্ন ঘটাবে। আর তাই কক্ষটির বাইরে কোনো গার্ড মোতায়েন করা হয়নি।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজের উদ্যোগের অভাব নিয়েও প্রশ্ন তোলে কমিশন।

হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহী সেনাদল জিয়াউর রহমানের মরদেহ ছিনিয়ে নিয়ে এক অজ্ঞাত স্থানে পুঁতে ফেলে (যা পরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় আবিষ্কৃত হয়)। ছিনিয়ে নেওয়র আগ পর্যন্ত জিয়ার মরদেহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলেই কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল।

প্রতিবেদনে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি (লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ) ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে সেনা সদর দপ্তরে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যাতে রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে একটি হেলিকপ্টার পাঠানো হয়।

তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কারও উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল না এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর স্থানীয় বেস কমান্ডারের কাছ থেকে একটি হেলিকপ্টার চাইতে তার কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা না, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, মাহফুজ সার্কিট হাউস থেকে ডিভিশনাল কমিশনারের বাসভবনে রাষ্ট্রপতির রোভার সেট (ওয়্যারলেস) বহন করে নিয়ে যান এবং ৩০ মে সকাল ১১টার পর মেজর লাজদানি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ ও অন্যদের ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেটটি এবং ওয়্যারলেস অপারেটর নায়েক আবুল বাশার সেখানেই ছিলেন। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ সেই সময়ে সেনা সদরদপ্তর থেকে কোনো তথ্য জানানোর বা কোনো নির্দেশনা চাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যদিও তার কাছে সব উপায়ই ছিল।

মেজর রওশন ইয়াজদানি ভূঁইয়া বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের অন্যতম এবং ৬৫তম পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর ছিলেন। সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) স্থানীয় কর্মকর্তা-ইন-চার্জ মেজর মুজিবুর রহমান দিনের বেলায় সার্কিট হাউস পরিদর্শন করেন এবং নিচতলায় রাষ্ট্রপতির সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

সেখানে তার থাকার কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছিল না। আমরা এটা মানতে রাজি নই যে, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এবং স্থানীয় জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি)-এর মধ্যকার সম্পর্কের প্রেক্ষাপট, সেইসঙ্গে মেজর জেনারেল মনজুরের কমান্ডাধীন ডিজিএফআই (ডিরেক্টরেট জেনারেল ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) এবং স্থানীয় এফআইইউ-এর মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন মাজহার অবগত ছিলেন না, এতে বলা হয়েছে।

তারা এই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করছিলেন যে, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিদ্রোহী সরকার গঠনকারী ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মনজুর প্রয়াত রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী আশা করা হয়েছিল যে, সার্কিট হাউসে মেজর মুজিবের অনাকাঙ্ক্ষিত সফরটি কোনো গোপন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রেকি করার জন্য ছিল—এ বিষয়ে একটি তীক্ষ্ণ সন্দেহ তৈরি হবে। এটা বেশ অদ্ভুত যে, তাদের কেউই সার্কিট হাউসে মেজর মুজিবের এই সফরকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি, এমনকি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও না।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন