হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (এইচবিভি) এইডস বা হিউম্যান ইমিউনো-ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাসের (এইচআইভি) চেয়েও ৫০ থেকে ১০০ গুণ বেশি ভয়ংকর বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের দাবি, বাংলাদেশে প্রতিবছর হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২২ হাজার মানুষ মারা যান। বর্তমানে বাংলাদেশে ৯৩ লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এরই মধ্যে ৬৯ লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর তোপখানা রোডের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের অডিটোরিয়ামে ‘হেপাটাইটিস প্রতিরোধে প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বরাত দিয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন।
হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সহযোগিতায় এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
বৈঠকে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী। এতে অন্যান্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় পুলিশ সুপার হসপিটালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. এবিএম খোরশেদ আলম ভূঞা, টিবি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক হলেন ডা. আয়েশা আক্তার, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মাজহারুল ইসলাম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ডা. দীপক কুমার মিত্র এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, হেপাটাইটিস মূলত পাঁচ ধরনের ভাইরাস (এ, বি, সি, ডি ও ই) দিয়ে হয়। এর মধ্যে ‘এ’ ও ‘ই’ ছড়ায় দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে, যেখানে ‘ই’ ভাইরাস গর্ভবতী নারীদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। অন্যদিকে ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ রক্ত এবং দেহরসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। বিশেষ করে ‘বি’ ভাইরাস শরীরের বাইরেও সাত দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। অসচেতনতার কারণে সেলুনে একই ব্লেড ব্যবহার, অনিবন্ধিত দন্তচিকিৎসকদের জীবাণুযুক্ত যন্ত্রপাতি এবং ফার্মেসিতে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ পুনরায় ব্যবহারের ফলে এই ভাইরাস মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। গত দুই বছরে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ৫০ লাখ শিশু বি ভাইরাসের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যা ভবিষ্যতে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রায় দুই বছর টিকাদান বন্ধ রাখার পেছনে যারা জড়িত ছিলেন, তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। তারা এই ভাইরাসের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, এবারে স্বাস্থ্য খাতে বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দের অর্থ দিয়ে উপজেলায় ব্যয়বহুল ‘ক্যাথে ল্যাব’ বা ভবন নির্মাণের চেয়ে রোগ প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং ১ কোটি মানুষকে গণটিকাদানের আওতায় আনলে এক বছরেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তা ছাড়া, বিগত সরকারের সময়ে যেসব এমপি-মন্ত্রীরা দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ গড়েছেন, তাদের সেই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেও এই অর্থের জোগান দেওয়া যেতে পারে। এজন্য ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার মতো খরচ হতে পারে।
অন্যান্য বক্তার বলেন, হেপাটাইটিস বি ভাইরাস রক্তদান, মুখের লালা, ইনজেকশন সিরিঞ্জ বা সুচ, মাদক, অনিয়ন্ত্রিত যৌন মিলন, গর্ভবতী মায়ের থেকে সন্তানের মাঝে এবং শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে টিক নেওয়া একমাত্র সুরক্ষার উপায়। এই ভাইরাসের ফলে মানুষের প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশে তরুণ-তরুণীরা বিয়ে করতে চান না। জাপানে ৩০ শতাংশের বেশি ছেলে-মেয়ে বিয়ে করতে অনাগ্রহী। এর কারণ হলো, তাদের চাহিদা কমে যাচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছ, হেপাটাইটিস বি এজন্য অনেকটা দায়ী।
খুলনা গেজেট/রুএ

