গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ঘোষেরচর উত্তরপাড়া গ্রামের জামিল শেখের ছেলে পলাশ শেখ। ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে দাদা-দাদীর কাছে বড় হন। সেই থেকেই দু’চোখে স্বপ্ন ছিলো পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর। পরিবারকে আর্থিক সচ্ছলতা দিতে ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডে এজেন্সি ও দালালের মাধ্যমে গত ৭ মে পাড়ি জমান রাশিয়ায়।
সেখানে পৌঁছানোর পর দালাল চক্র সেখানকার রাশিয়ার সেনাবাহিনীর জিম্মায় দিয়ে জোর করে এক বছরের চুক্তি করানো হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য তাদের চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে। পরে তিনি জানতে পারেন বাংলাদেশি জাবালে-ই-নুর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এজেন্সি ও দালাল চক্র তাকে ৩৫ লাখ টাকায় রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। বর্তমানে তাকে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধের সাময়িক প্রশিক্ষণ, ফোনে পরিবারকে এমনটাই জানিয়েছে ভুক্তভোগী পলাশ শেখ।
একই অবস্থা গোপালগঞ্জ সদরের সিতারকুল এলাকার লিচু ফকিরের ছেলে রনি ফকিরের। ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর সেখানকার সেনাবাহিনী তাকে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয়। পরে তাকে জোর করে একবছরের জন্য রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে। পরে রনি জানতে পারে তাকে ৩৫ লাখ টাকায় রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।
এ ঘটনায় তাদের একজনের বাবা ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সি জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। তবে পুলিশ অভিযোগটি এখনো মামলা হিসেবে না নিয়ে আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটির) সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে।
অন্যদিকে, বিএমইটি বলছে, মামলার জন্য তাদের সংশ্লিষ্টতা লাগবে না। পুলিশ মামলা না নেওয়ার যে কারণ দেখিয়েছে, তা ‘অযৌক্তিক’। আর গোপালগঞ্জ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
গত বুধবার সকালে ওই যুবকদের বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে নেয়া ৩০ যুবককে ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধের জন্য রাশিয়া সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই এজেন্সি ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে। এরমধ্যে ৩ জন রয়েছে গোপালগঞ্জের পলাশ শেখ, রনি ফকির ও বলাকৈড় গ্রামের কবির মোল্লার ছেলে সৌরভ মোল্লা।
রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করার খবরে গোপালগঞ্জে তিন যুবকের পরিবারে এখন শুধু কান্নার রোল।
পলাশ শেখের দাদা বালা শেখ জানান, ছোট বেলায় মাকে হারিয়ে আমাদের কাছে বড় হয় পলাশ। ভালো চাকরির আশায় ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে সে রাশিয়া যায়। এখন শুনছি ওকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। আমি আমার পলাশকে ফেরত চাই।
পলাশ শেখের বাবা মোঃ জামিল শেখের করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘ঢাকার জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মোঃ মিজানুর রহমান গোপালগঞ্জের তিন যুবককে মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে রাশিয়ায় কনস্ট্রাকশন সাইটে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখান। পরে প্রত্যেকের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নিয়ে গত ৭ মে গোপালগঞ্জের তিনজনসহ ৩০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতারণা করে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে ‘বিক্রি করে’ দেওয়া হয়।’
সুতিয়ারকুল গ্রামের রনি ফকিরের স্ত্রী তৃষ্ণা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। দালালের মাধ্যমে তার জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তারা তাকে রাশিয়া নিয়ে মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে নির্মাণকাজের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখানে নিয়ে তার মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। মাঝে মাঝে কিছু সময়ের জন্য তাদের হাতে মোবাইল দেওয়া হয়। সুযোগ পেয়ে এসএমএস ও অডিও বার্তায় রনি জানিয়েছে, তাদের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে, চুল কেটে ফেলা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বন্দুকের মুখে জিম্মি করে সীমান্তবর্তী ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। গত সোমবার শেষবার রনির সঙ্গে যোগাযোগ হলে রনি রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি একটি সেনা ক্যাম্পে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন। সেখানে গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। জীবন নিয়ে সংশয় ও আতঙ্কের মধ্যে আছেন তিনি।’
বলাকৈড় গ্রামের সৌরভ মোল্লার চাচি লিমা আক্তার সুখী বলেন, ‘ঢাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা দিয়ে সৌরভকে বিদেশে পাঠানো হয়। ৭ মে বেলা ১১টায় ছিল তার ফ্লাইট। ১৭ মে সৌরভের সঙ্গে পরিবারের কথা হয়। পরে ভিডিও কলে তাকে সামরিক পরিবেশে দেখা গেছে।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কৌশিক আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি আমরা শুনেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মোঃ হাবীবুল্লাহ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগী কোন পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
খুলনা গেজেট/এনএম

