পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধুলিয়া গ্রামে তেঁতুলিয়া নদীর তীরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের আন্দোলনে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দাঁড়ানো অকুতোভয় ভাষাসৈনিক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আশরাফ হোসেনের সমাধি। স্বাধীনতা ও ভাষা আন্দোলনের এই সাহসী সৈনিকের সমাধিস্থল সংরক্ষণে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, যা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছর আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাগজপত্র জমা নিয়ে সমাধিস্থলটি সংরক্ষণের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে সরেজমিনে সমাধিস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাউফলের ধুলিয়া গ্রামে তেতুলিয়া নদীর তীরে পরিবারের সদস্যদের পাশেই ভাষা সৈনিক সৈয়দ আশরাফের কবর। সমাধিস্থলের চারপাশে বড় কোনো সীমানা প্রাচীর না থাকায় গরু-ছাগল অবাধে চলাচল করতে পারে। লতাপাতায় ঢেকে জরাজীর্ণ সমাধির ওপর জমেছে ধুলোবালি। পাশেই কাঠের দুটি খুঁটির সঙ্গে টানানো ভাঙাচোরা একটি ব্যানারে লেখা রয়েছে শুধু নাম-পরিচয়।
জাতির এমন এক গর্বিত সূর্যসন্তানের সমাধিস্থলের করুণ অবস্থা এবং সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সৈয়দ আশরাফ হোসেন ১৯২৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধুলিয়া গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্থানীয় ধুলিয়া বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, বরিশালের ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি ভাষা আন্দোলনে প্রথম সারির সক্রিয় সংগঠক হিসেবে যুক্ত হন। ১৯৬৫ সালে পটুয়াখালী থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ন্যাপের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাশাপাশি তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ২০০৮ সালের ৩ মে তিনি ইন্তেকাল করেন।
স্থানীয়রা জানান, সৈয়দ আশরাফ হোসেন পটুয়াখালী জেলার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। কিন্তু নতুন প্রজন্ম তার সম্পর্কে খুব কমই জানে। তরুণদের কাছে তার অবদান তুলে ধরতে এবং একজন ভাষা সৈনিকের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, সৈয়দ আশরাফের স্মৃতি রক্ষার্থে সমাধি কমপ্লেক্স, স্মৃতিফলক ও একটি স্মৃতি পাঠাগার নির্মাণ করা হোক।
স্থানীয় কলেজ ছাত্র হুজাইফা ইসলাম বলেন, তার সমাধিস্থলটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এমন একজন ভাষা সৈনিকের বর্ণাঢ্য জীবনের ইতিহাস ও সংগ্রামের গল্প তরুণ প্রজন্মের নিকট তুলে ধরতে একটি স্মৃতি পাঠাগার নির্মাণ করতে সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
ধুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সৈয়দ আশরাফ হোসেনের স্মৃতি সংরক্ষণে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও ভবিষ্যতে তার সমাধি সংরক্ষণে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
সৈয়দ আশরাফের ছেলে সৈয়দ মাইনুল হাসান সুমন বলেন, আমার বাবাসহ আমাদের পরিবারের দেশের প্রতি অনেক অবদান রয়েছে। দেশের পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ায় ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে আমাদের বাড়িঘর পোড়ানো হয়েছিল। বাবা একজন ভাষা সৈনিক ছিলেন, ছিলেন ’৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধা, এমপি হয়ে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আমরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কখনোই কিছু প্রত্যাশা করিনি, পাইওনি। শুধুমাত্র একবার জেলা প্রশাসন থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, তাও চরম অব্যবস্থাপনা ছিল—ক্রেস্টে অনেক ভুল ছিল।
সমাধির বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভাঙনকবলিত তেতুলিয়া নদীর তীরে আমাদের পারিবারিক সমাধিস্থল অবস্থিত। আমাদের বাগানের প্রায় অর্ধেক নদীতে ভেঙে গেছে। যদিও এখন ভাঙন স্থির রয়েছে, তবে ভবিষ্যতে নদীভাঙনের এক পর্যায়ে সমাধিস্থল বিলীনের আশঙ্কা রয়েছে।
আমরা কোনো এপ্লিকেশন দেইনি। দুই বছর আগে সমাধিস্থল সংরক্ষণের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকেই যোগাযোগ করে বিভিন্ন কাগজপত্র নেওয়া হয়েছিল। শুনেছিলাম প্ল্যানও পাশ হয়েছিল। অনাপত্তিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল- আমার বড় ভাই স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু এরপর এখন পর্যন্ত আর কোনো সংবাদ পাইনি।’
বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, আসলে আমি বিষয়টি অবগত ছিলাম না। আমি এখানে যোগদানের পর তাদের পরিবারের কেউ আসেননি। আমি আজই খোঁজ-খবর নেব। পরিবারকে যদি এর আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকে, ইনশাল্লাহ আমরা তা বাস্তবায়ন করব। এখানে যদি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়ে থাকে, সেটি আমরা যাচাই করব এবং পরিবারের সঙ্গে কথা বলব। আগের পরিকল্পনাটি যথাযথ হলে সেটিই বাস্তবায়ন করব, আর প্রয়োজন হলে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আরও সুন্দরভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
খুলনা গেজেট/এমএনএস

