আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা শুরুর সিদ্ধান্তকে বাস্তবতাবিবর্জিত, আত্মঘাতী ও প্রকাশনাশিল্পকে প্রবল অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল বলে অভিহিত করে তাতে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৩২১ জন প্রকাশক।
প্রকাশকদের চাওয়া, ২০ ফেব্রুয়ারি নয়, ঈদের পরেই হোক ‘প্রাণবন্ত’ বইমেলা। ঈদের পরে মেলা হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হলে সেই ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন প্রকাশকরা।
রবিবার (8 ফেব্রুয়ারি) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশকরা ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬’ নিয়ে নিজেদের এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বইমেলা কোনো সরকারি রুটিন ওয়ার্ক বা কেবল আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মিলনমেলা। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পরপরই রোজার মধ্যে মেলা আয়োজনের যে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে মেলার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।’
বিবৃতিতে প্রকাশকরা বলেন, “আমাদের সামগ্রিক অবস্থানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ মেলা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে নতুন নতুন প্যাভিলিয়ন ও স্টল বরাদ্দ দিচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের জ্যেষ্ঠতা ও মান যাচাইয়ের নিয়ম ভেঙে অযোগ্যদের বড় স্টল দেওয়ায় ভবিষ্যতে ভুল নজির তৈরি হবে।
পরবর্তীতে এই বরাদ্দকেই তারা ‘আইনি অধিকার’ দাবি করে বিশৃঙ্খলা ও মামলা-মোকদ্দমার পথ তৈরি করবে। শূন্যস্থান পূরণের হুজুগে অযোগ্য বা সুবিধাভোগীদের জায়গা দেওয়ায় মেলার ব্যাবসায়িক পরিবেশ ও প্রকাশনার ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে প্রকৃত পেশাদার প্রকাশকরা কোণঠাসা হয়ে পড়বেন এবং মেলার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।”
প্রকাশকরা কেন ঈদের পর মেলা চান—তার ব্যাখ্যায় বিবৃতিতে পাঠকশূন্যতার আশঙ্কা, মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হলে মাত্র কয়েক দিন পরেই পবিত্র মাহে রমজান শুরু হবে। রোজার দিনে তীব্র গরম ও যানজট ঠেলে পাঠকরা মেলায় আসবেন না। পাঠকহীন মেলা প্রকাশক ও আয়োজক— উভয়ের জন্যই বিব্রতকর।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘মেলার স্টলগুলোতে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কাজ করেন। সারাদিন রোজা রেখে, ইফতার ও তারাবিহ নামাজের পর এই শিক্ষার্থীদের দিয়ে কাজ করানো অমানবিক।
গত দেড় বছরে প্রকাশনাশিল্প চরম মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আরো একটি অসফল মেলায় অংশ নিয়ে অবশিষ্ট পুঁজি হারানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’
ঈদের পর মেলা আয়োজনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা একাডেমি ‘এপ্রিলে ঝড়-বৃষ্টির অজুহাত দেখিয়েছে’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই— ঈদের পরে মেলা হলে যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয়, সেই ঝুঁকি আমরা নিতে প্রস্তুত। কিন্তু জেনেশুনে রোজার মধ্যে মেলা করে নিশ্চিত ব্যাবসায়িক মৃত্যুর ঝুঁকি আমরা নেব না।’
বাংলা একাডেমি ছাড়াও সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার শরণাপন্ন হয়েছেন জানিয়ে বিবৃতিতে প্রকাশকরা বলেন, ‘আমাদের আশা ছিল, বর্তমান সরকার অংশীজনের মতামতের গুরুত্ব দেবে। কিন্তু অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলতে হয়, সরকারের নীতিনির্ধারক মহল প্রকাশকদের এই অস্তিত্বের সংকট অনুধাবন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। রাষ্ট্র যখন কেবল বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতা রক্ষায় ব্যস্ত, তখন আমরা প্রকাশকরা অস্তিত্ব রক্ষায় লড়ছি।’
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নেওয়া আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে একটি সৃজনশীল শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়লে তার দায়ভার সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রকাশকদের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে প্রকাশনা খাত সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এবং বাংলা একাডেমির প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান—জেদ পরিহার করুন। প্রকাশকদের এই গণদাবি মেনে নিয়ে বইমেলা ঈদুল ফিতরের পর আয়োজন করুন। যখন মানুষ উৎসবের আমেজে বই কিনবে।’
খুলনা গেজেট / এম এন এস

