উত্তরের হিমেল হাওয়ার ঝাপটায় হাড়কাঁপানো শীত আর ঘন কুয়াশায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসে। গতকাল দিনভর অধিকাংশ স্থানে সূর্যের দেখা মেলেনি। সড়ক-মহাসড়কে ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে পরিবহণগুলো চলেছে হেডলাইট জ¦ালিয়ে। শ্রমজীবী বয়স্ক মানুষ কাজে যেতে না পেরে জড়সড় হয়ে দিন পার করেছে। কোথাও কোথাও বীজতলা নষ্ট হবার কথা জানিয়েছেন কৃষকরা।
ফকিরহাট
আমাদের ফকিরহাট প্রতিনিধি জানান, পৌঁষের শেষ দিকে এসে প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর আস্তরণে ঢাকা পড়ে ফকিরহাট। ভোর থেকেই ঘন কুয়াশার এক নিশ্ছিদ্র চাদরে বন্দি হয়ে ছিলো পুরো উপজেলা। হিমেল হাওয়ার ঝাপটায় হাড়কাঁপানো শীত আজ কেবল ঋতুর পরিবর্তন নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য এক চরম যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূর্যের দেখা মেলা তো দূরের কথা, কুয়াশার ঘনত্ব এতটাই বেশি যে দিন আর রাতের পার্থক্য করাও আজ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই তীব্র শীতের প্রথম বড় প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম ব্যস্ত খুলনা-মাওয়া মহাসড়কে। দক্ষিণাঞ্চলের এই লাইফলাইনটি আজ কুয়াশার কবলে পড়ে প্রায় স্থবির। কয়েক হাত দূরের যানবাহনও দেখা যাচ্ছে না, ফলে বড় বড় বাস আর পণ্যবাহী ট্রাকগুলো হেডলাইট জ¦ালিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে পিঁপড়ার মতো চলছে। চালকদের চোখে মুখে দুর্ঘটনার আতঙ্ক, আর দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকা যাত্রীদের কণ্ঠে ঝরছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা।
ফকিরহাটের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এখন বোরো ধান রোপণের অপেক্ষায় উন্মুখ; কিন্তু এই কনকনে ঠান্ডায় মাঠে নামাই যেন এক দুঃসাধ্য লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য। চিকিৎসকরা এই হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শরীর বাঁচাতে ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিলেও, ফকিরহাটের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের সেই সুযোগ নেই।
শীতের এই ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে এখন যে ক’জন রোগী ভর্তি আছেন, তাদের প্রায় সবাই শীতজনিত রোগে আক্রান্ত। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া আর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে চারপাশ। বয়স্করা ভুগছেন হাঁপানি আর তীব্র বুকের ব্যথায়। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও।
সবচেয়ে বেশি বুক ফেটে যায় সড়কের পাশের ছিন্নমূল মানুষদের দেখে। যাদের মাথার ওপর শক্ত ছাদ নেই, গায়ে দেওয়ার মতো এক টুকরো ভালো কাপড় নেই, তাদের জন্য এই শীত এক বিভীষিকার নাম। ভোরের দিকে পথের ধারে, খড়কুটো জ্বালিয়ে এক চিলতে আগুনের ওমে একটু উষ্ণতা খোঁজার সেই আকুতি প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়।

গোপালগঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গোপালগঞ্জে জেঁকে বসেছে শীত। উত্তরের হিমেল বাতাস আর ঘন কুয়াশার কারণে শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। এতে বিপর্যস্ত হয়েছে পড়েছে জেলার জনজীবন। জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ০৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
জেলা শহর ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকে কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো জেলা। তীব্র ঠান্ডায় জমিতে যেতে পারছেন না কৃষক। ফলে ভরা বোরো মৌসুমে বোরো আবাদ নিয়ে শংকায় পড়েছেন তারা। কোথাও কোথাও বীজতলা নষ্ট হবার কথা জানিয়েছেন কৃষকরা। তীব্র শীতে জেলায় দেখা দিয়েছে শীতজনিত রোগ। ঠান্ডা, জ¦র, কাশিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। ফলে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ছুটছেন তারা।
গোপালগঞ্জ ২৫০-শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ জীবীতেশ বিশ্বাস বলেন, “ঠান্ডা পড়ায় জেলায় শীতজনিত রোগের দেখা দিয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের সব সময় গরম কাপড় পরিয়ে রাখার পাশাপাশি গোসলে মৃদু গরম পানি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।”
সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, হিমেল হাওয়া আর হাড়কাঁপানো কনকনে শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। গত দুই দিন ধরে এ অঞ্চলে সূর্যের দেখা মেলেনি। কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাসে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
গতকাল সোমবার সকালে সাতক্ষীরায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রোদ না ওঠা ও বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় শীতের তীব্রতা আরও বেড়েছে। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হতদরিদ্র, ছিন্নমূল ও খেটে খাওয়া মানুষ। সকাল থেকেই জেলাজুড়ে বইছে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বেলাতেও অনেক জায়গায় হেডলাইট জ¦ালিয়ে চলছে যানবাহন। গত ৪৮ ঘণ্টা সূর্যের উত্তাপ না থাকায় ভূপৃষ্ঠ হিমশীতল হয়ে পড়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। যারা বের হচ্ছেন, তাদের গায়ে ভারি গরম কাপড় দেখা যাচ্ছে।
শহরের মোড়ে মোড়ে এবং গ্রামাঞ্চলে ছিন্নমূল মানুষদের খড়কুটো, কাঠ ও আবর্জনা জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। তীব্র শীত উপেক্ষা করেই অনেক শ্রমজীবী মানুষ জীবিকার তাগিদে বাইরে বের হচ্ছেন। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শীতজনিত নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অ্যাজমা ও সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শিশু ও বয়স্করা বেশি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
খুলনা গেজেট/এনএম
