বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

বিদ্রোহী কবির এ যুগের উত্তরসূরি

কাজী মোতাহার রহমান

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৈনিক জীবন ১৯১৭-১৯২২। ছিলেন ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার। সেনাবাহিনীর চাকুরী ছেড়ে এসে বিদ্রোহী কবিতা লিখে ভারতবর্ষে তোলপাড় করেন। তখন ইংরেজ শাসনামল। ব্রিটিশ তার এ কবিতা সহ্য করতে পারেনি। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় বিদ্রোহী নামক কবিতাটি। যা ওই সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তখন থেকেই তিনি বিদ্রোহী হিসেবে বাঙালির কাছে পরিচিতি পান। কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক ও বামদের বিভিন্ন সময়ে মুখে মুখে ছিলো এ কবিতাও। বাঙালি স্বাধীনতা চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে থাকে।

আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠুমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!
আমি চপলা-চপল হিন্দোল!
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!

পংক্তিটি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী-এর অংশ। যা তাঁর অগ্নিবীণা কাব্যগ্র অন্তর্ভুক্ত এবং এটি বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহ ও আত্ম-মহিমার এক অসাধারণ প্রকাশ।
কবিতাটি প্রায় আবৃত্তি করতেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসাসিম বিন হাদি। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুাত্থানের প্রথম সারির যোদ্ধা। জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তিনি জাতির কাছে স্বীকৃতি পেয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে তার উত্থান। গণঅভ্যুাত্থান পরবর্তী ইনকিলাব মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী সোচ্চার ছিলেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়েও তার ভূমিকা ছিল।

ঝালকাঠি জেলা নলছিটি উপজেলার সন্তান। লেখাপড়া করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রতিবাদী মঞ্চে দাড়িয়ে কবির এ কবিতা পাঠ করে জনগণকে উব্দুদ্ধ করতেন। জুলাইয়ের চেতনা ধরে রাখতে ছাত্র সমাজকে সাহস জোগাতেন। একাত্তর পরবর্তী বেশ কয়েকজন ছাত্র নেতার প্রতিচ্ছবি তার মধ্য দিয়ে ভেসে ওঠে। তিনি জাতীয় চেতনাবাদে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। জুলাই পরবর্তী দখলদার ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধ কথা বলে ছাত্রসমাজের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে ঢাকা-৮ আসনের মানুষের কাছে তিনি প্রিয় হয়ে ওঠেন। জনগণের সমর্থন পেয়ে তিনি সংসদে প্রতিনিধিত্ত্ব করতে চেয়েছিলেন।

গেল ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে দূর্বৃত্তের ছোঁড়া গুলিতে তিনি আহত হন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন তিনি। ইথারে ইথারে এ খবর বাংলাদেশ ভূখন্ডে পৌঁছালে জাতি স্তব্ধ হয়ে যায়। গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালিত হয়।

এ বীরের মৃত্যুতে সকল মত ও পথের মানুষের চোখে অশ্রু নেমে আসে। তিনি বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন নতুন বাংলাদেশ। সে আশা পূরণ হয়নি। নির্বাচনের পূর্বে তার কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। তার ওপর আঘাত বুঝতে পেরে স্বজনদের বলেছিলেন, আমার শিশু বাচ্চাটিকে দেখে রেখ। সতীর্থদেরকে সাহস জোগাতেন বিদ্রোহী কবির বিদ্রোহী কবিতার পংক্তিগুলো আবৃত্তি করে।

ঢাবি, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ও শাহাবাগ চত্বরে বক্তৃতাকালে দুহাত প্রশস্ত করে দেশবাসীকে আশার বাণী শোনাতেন। বক্তৃতায় যেন আগুনের ফুলকি ভেসে উঠত। চব্বিশের যোদ্ধা পচিশের বিদ্রোহী কণ্ঠ। জাতির ইচ্ছা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবির কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। লাল সবুজের পতাকা দিয়ে এ জাতীয় বীরকে সম্মানিত করা হয়। তিনি ছিলেন কাজী নজরুল প্রেমিক। তিনি স্পষ্ট বুঝেছিলেন, বিদ্রোহী কবিতার মধ্য দিয়ে জাতিকে বিদ্রোহী করা সম্ভব। পঁচিশের শেষ প্রান্তে এসে প্রমাণিত হল তিনি জাতীয় কবির এ যুগের সুযোগ্য উত্তরসূরী। মৃত্যুঞ্জয়ী হাদি জীবদ্দশায় ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’ নামের কবিতা লেখেন।
কবিতার প্রথম পংক্তিটি হচ্ছে-
আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন
হে সীমান্তের শকুন
এক্ষুনি ছিঁড়ে খাও আমাকে
হে আটলান্টিকের ঈগল
শিগ্গির খুবলে খাও আমাকে
হে বৈকাল হ্রদের বাজ
আঁচড়ে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করো আমাকে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন