Edit Content
খুলনা, বাংলাদেশ
শনিবার । ৩০শে আগস্ট, ২০২৫ । ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩২
Edit Content
বারবার কয়লা আমদানির দরপত্র বাতিল

আড়াই বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রায় ‘নিষ্কর্মা’

গেজেট ডেস্ক

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নির্মিত কয়লাভিত্তিক বৃহৎ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কয়লা সরবরাহে চতুর্থ দফায় ডাকা দরপত্রও বাতিল করা হয়েছে। দরপত্রে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম ও ত্রুটির কথা উল্লেখ করে তা বাতিলের সুপারিশ করেছে এ সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটি। একই সঙ্গে কয়লা আমদানির জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চতুর্থ দফায় দরপত্র বাতিলের মধ্য দিয়ে বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

দরপত্র সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে আরএনপিএলকে গত ৭ আগস্ট পাঠানো বিদ্যুৎ বিভাগের এক চিঠিতে বলা হয়েছে, কয়লার জন্য আহ্বান করা দীর্ঘমেয়াদি দরপত্রের বিভিন্ন ধাপে ত্রুটি ও অনিয়ম পাওয়া গেছে। তাই কয়লা আমদানিতে আহ্বান করা এ দরপত্র বাতিল করে দ্রুত নতুন দরপত্র আহ্বান করতে হবে। সেইসঙ্গে ভবিষ্যতে কয়লা কেনার ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন, বিশেষ করে কয়লার ক্যালোরিফিক ভেল্যু (জিএআর), অ্যাশ ফিউশন টেম্পারেচার, কয়লার সাইজ দরপত্রের শর্তে এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যেন দরপত্র প্রক্রিয়া অবাধ, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করা যায়।

কয়লা কেনার দরপত্র সংক্রান্ত কমিটি আগামীতে কয়লা কেনার চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছরের পরিবর্তে দুই বছর করার সুপারিশ করেছে। এর আগে কয়লার স্পেসিফিকেশন (ক্যালরিফিক ভ্যালু), অ্যাশ ফিউশনসহ নানা চাহিদা কমিয়ে ও শর্ত শিথিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করার কথা বলা হয়েছিল। এবার একই কারণ দেখিয়ে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করেছে মূল্যায়ন কমিটি।

সূত্র বলছে, কয়লার মান ও অ্যাশ ফিউশন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ডিজাইন অনুযায়ী আরও কমানো হলে তাতে কয়লা কিনে তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার কিলোক্যালরি কম হলে তাতে জ্বালানি ব্যয় বেশি হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে তিন দফায় কেন্দ্রটির জন্য দীর্ঘমেয়াদে কয়লা সরবরাহের দরপত্র ডেকেও কোনো কোম্পানি চূড়ান্ত করতে পারেনি আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি লিমিটেড (আরএনপিএল) কর্তৃপক্ষ।

আরএনপিএল সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সরবরাহের জন্য ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রে বেশ কয়েকটি কোম্পানি শিডিউল কেনে। সাতটি কোম্পানিকে শর্ট লিস্টও করা হয়। এর মধ্যে ছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইয়াংথাই এনার্জি পিটিই লিমিটেড। তবে দরপত্রে কিছু পরিবর্তন আনার কারণে তা বাতিল করা হয়। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য দীর্ঘমেয়াদে কয়লা আমদানি চুক্তির জন্য গত বছরের ১৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দরপত্রে পাঁচটি কোম্পানি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়। ওই বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি দরপত্র খোলার সময়সীমা ছিল। ওই দরপত্রে ইয়ংথাই কারিগরিভাবে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই দরপত্র বাতিল হয়ে যায়।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আরএনপিএলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা আমদানির জন্য গত ৬ নভেম্বর তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে দেশি-বিদেশি অন্তত ২৫টি কোম্পানি অংশ নেয়। ওই দরপত্রে কোম্পানির আর্থিক যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কয়লাখনি, কয়লার মান সংক্রান্ত শর্ত নিয়ে আরএনপিএলের রিভিউ মিটিং হয়। তখনও শুধু সিঙ্গাপুরভিত্তিক ইয়াংথাই এনার্জি দরপত্রের শর্তের সবকিছু পূরণ করে কাগজপত্র জমায় দেয়।

অন্য কোম্পানিগুলো দরপত্রে চাহিদা অনুযায়ী কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় টেন্ডার থেকে ছিটকে পড়ে। এ দফায় বাদ পড়া বিভিন্ন কোম্পানি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে দরপত্রে কঠিন শর্ত থাকায় প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে তা শিথিলের অনুরোধ জানায়। বিষয়টি বিবেচনা করে কয়েকটি শর্ত শিথিল করার পাশাপাশি সময়ও বাড়ানো হয়। এরপরও বাকিরা দরপত্র দাখিল করেনি। ফলে ইয়াংথাই এনার্জি একক দরদাতা হয়। চতুর্থ দফার দরপত্রে ইয়াংথাই কারিগরিভাবে যোগ্য নির্বাচিত হলেও আর্থিক ত্রুটি ও অনিয়ম দেখিয়ে দরপত্র বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।

অবশ্য আরএনপিএলের দরপত্র অনুযায়ী শর্ত পূরণ করে বিদেশি একটি কোম্পানি নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় কোম্পানিগুলোর অনেকে দরপত্র থেকে বাদ পড়ায় বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। এসব অনিয়ম নিয়ে কমিটি সুপারিশ করলেও সুনির্দিষ্ট করে ওই বিদেশি কোম্পানির দরপত্র বাতিলের তেমন কোনো কারণ দেখাতে পারেনি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আরএনপিএল পরিচালিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটি বর্তমানে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট প্রস্তুত হলেও কয়লা সরবরাহকারী কোম্পানি নির্বাচন করতে না পারায় পূর্ণ সক্ষমতায় এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এতে কেন্দ্রটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কারণ, কেন্দ্রটি নির্মাণে ব্যয় হওয়া ২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার চীনের ঋণ রয়েছে। ১৫ বছর মেয়াদি এই ঋণচুক্তির মধ্যে চার বছর গ্রেস পিরিয়ড (ঋণ পরিশোধ শুরুর আগে পাওয়া বিশেষ ছাড়)। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে এই ঋণ চুক্তি হয়। চুক্তির শর্তে বলা হয়, প্রকল্প শেষ হওয়ার ছয় মাস পর থেকে ঋণ পরিশোধ শুরু হবে।

প্রকল্প শেষে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু করে। জুন মাসে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও দরপত্রের জটিলতায় তা এখনো শুরু হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প শেষের ছয় মাস শেষ হয়ে গেছে। ফলে ঋণ পরিশোধের বিষয়টি সামনে চলে এলেও বাণিজ্যিকভাবে চালু না হওয়ায় কেন্দ্রটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধ নিয়েও। কারণ, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার না করলেও সরকারকে বড় আকারের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পরিশোধ করতে হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৃহৎ কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি কয়লা সরবরাহকারী নিশ্চিত করতে চায় আরএনপিএল কর্তৃপক্ষ। সেজন্য দফায় দফায় বিভিন্ন শর্ত দিয়ে দরপত্র চাওয়া হয়। কিন্তু কারিগরিভাবে নির্বাচন করা গেলেও আর্থিক মূল্যায়নে নানাভাবে দরপত্র আটকে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত হলেও জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ সংকটের কারণে বিপুল পরিমাণ লোকসান দিতে হচ্ছে সরকারকে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে এই লোকসান ভর্তুকি হিসেবে জনগণের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানে সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন