সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রের সাদা পাথর উদ্ধারে অভিযান চালিয়েছে যৌথবাহিনী। বুধবার মধ্যরাতে ভোলাগঞ্জ সড়কের প্রবেশমুখে অভিযান চালায় তারা।
আমদানির প্রমাণপত্র যাচাই করে বৈধ পাথরবাহী ট্রাকগুলো যেতে দেয়া হচ্ছে। যৌথবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে ট্রাকে করে আনা এসব পাথরের আমদানির প্রমাণপত্র পরীক্ষা করে দেখেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
তবে চালকরা অভিযোগ করেন, তাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও হয়রানি করা হচ্ছে। তারা দাবি করেন, ক্রাশার মিলে অভিযান চালানো উচিত।
পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু সিলেটের দৃষ্টিনন্দন সাদা পাথর ও প্রকৃতিকন্যা জাফলং। স্থান দুটির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য পাথরগুলো লুট হয়ে গেছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে দেশে সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
এক বছর ধরে সরিয়ে ফেলা প্রাকৃতিক সম্পদের বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা হলেও এর মাধ্যমে ভূপ্রকৃতির কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক ঐকমত্যের কাছে অসহায় প্রশাসনের আত্মসমর্পণের কারণে এতবড় কেলেঙ্কারি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারক ও পরিবেশবিদরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখা গছে, এ দুটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মুখে মুখে ছিল সিলেটের দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম অনুষঙ্গ সাদা পাথর চুরির ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বিষয়টি নিয়ে বেশ সরগরম। ঐকমত্যের ভিত্তিতে পাথর চুরির ঘটনায় রাজনৈতিক নেতাদের তুলাধুনা করছেন পর্যটকরা। তাদের অভিমত, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লিলাভূমি রাজনৈতিক দলের নেতাদের দানবীয় লুটপাটের কারণে এখন মরুভূমিতে রূপ নিয়েছে।
পাথর লুটে রাজনৈতিক ঐকমত্য: দেশের সমস্যা নিরসনে রাজনৈতিক নেতারা একমত হতে না পারলেও পাথর লুট, পাহাড় কাটা ও নদী দখলসহ বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে ঐকমত্য আছে। এমন অভিমত সিলেটের সাধারণ নাগরিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের।
সিলেটে পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করেন এমন একাধিক ব্যক্তি বলেন, জেলার জাফলংসহ বিভিন্ন স্থানে পাথর কোয়ারি নামে পাথর উত্তোলনের সঙ্গে কয়েক হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। একটি নির্দিষ্ট জায়গা থেকে তারা পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করতেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় প্রভাবশালীদের হাতে। ওই সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী, এমপি এবং স্থানীয় নেতারাও শতকোটি টাকার এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সিলেটের পাথর উত্তোলনের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
খনিজসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর রক্ষা করার জন্য মন্ত্রণালয় কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিল। রাজনৈতিক নেতারা এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেন।
কয়েকটি সূত্র জানায়, গত ১৪ জুন সিলেটে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাথর উত্তোলনকারী, ব্যবসায়ী, মালিক, শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল হয়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীও অংশ নেন। ওই কর্মসূচিতে সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামী সিলেট মহানগরের আমির ফখরুল ইসলাম ও জেলার সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিলেট জেলার প্রধান সমন্বয়কারী নাজিম উদ্দিন ও মহানগরের প্রধান সমন্বয়কারী আবু সাদেক মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম চৌধুরীসহ দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত হয়ে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার দাবি জানান।
সমাবেশে বিএনপি নেতা রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, যে ব্যবসার ওপর দাঁড়িয়ে ১০ লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করত, যে পাথর কোয়ারি এই জনপদের মানুষ তাদের কাছে একটি পবিত্র আমানত হিসেবে মনে করত, সেই পাথর কোয়ারি বন্ধ করে দিয়ে ১০ লাখ মানুষের পেটে লাথি মারা হয়েছে। আর জামায়াত নেতা ফখরুল ইসলাম বলেন, যে বা যারাই পরিবেশের দোহাই দিয়ে এখানে পাথর-বালু উত্তোলনের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে, তাদের আরো কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, সেটা এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।
খুলনা গেজেট/এনএম