ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের নীতিমালা, ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও ভুল তথ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছে মেটা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালতে শুনানি শেষে জুরি বোর্ডের রায়ে এ কথা বলা হয়েছে।
শুক্রবার সান্তা ফে শহরের একটি আদালতে দেওয়া রায়ে বলা হয়, অঙ্গরাজ্যটির পক্ষ থেকে চিহ্নিত ২৯টি বক্তব্যের মধ্যে ২৬টি ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে। এসব বক্তব্যের মধ্যে ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহারের পদ্ধতি, ঘৃণাত্মক বক্তব্য এবং ভুল তথ্য নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিষয় ছিল।
তবে মেটা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেছেন, রায়ের সঙ্গে তারা একমত নয় এবং নিজেদের অবস্থান রক্ষায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।
এই মামলার সূত্রপাত কয়েক বছর আগে প্রকাশ পাওয়া ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি থেকে। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে যুক্ত রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা একটি তৃতীয় পক্ষের অ্যাপের মাধ্যমে কোটি কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে জানা যায়, এভাবে সর্বোচ্চ ৮ কোটি ৭০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে।
২০২১ সালে নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেন। দুই সপ্তাহ ধরে চলা শুনানি শেষে শুক্রবার মামলাটির রায় দেন জুরি।
অঙ্গরাজ্যটির অভিযোগ ছিল, মেটা ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে ভাগ করা হয়, সে বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। পাশাপাশি ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও ভুল তথ্য নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানটির নীতিমালা নিয়েও ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
নিউ মেক্সিকোর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ফেসবুকের তথ্য তৃতীয় পক্ষের অ্যাপের কাছে যাওয়ার বিষয়টি ব্যবহারকারীদের কাছে যথেষ্টভাবে পরিষ্কার করা হয়নি। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার তথ্য সংগ্রহের ঘটনাতেও এমন একটি অ্যাপ ব্যবহৃত হয়েছিল।
তবে মেটার আইনজীবীরা আদালতে বলেন, অঙ্গরাজ্যের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের কিছু অংশ আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই বক্তব্যের অন্য অংশে মেটা ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা ও ভুল তথ্য নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছিল বলে তারা দাবি করেন। মেটা আরও বলেছে, তারা ব্যবহারকারীদের তথ্য বিক্রি করে না।
জুরি মেটার বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করার পর এখন জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করবেন বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ। মামলায় ৪ কোটি ৩০ লাখের বেশি লঙ্ঘনের বিষয় উঠে এসেছে। নিউ মেক্সিকোর আইনে প্রতিটি লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা করার সুযোগ রয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ বলেছেন, তার দপ্তর কত জরিমানা চাওয়া হবে তা পর্যালোচনা করছে। তবে জুরির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ জরিমানা চাওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এ ছাড়া মেটাকে ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করবে অঙ্গরাজ্যটি। এর মধ্যে অতীতে দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্য সংশোধন এবং ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয়, তা নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখার বিষয়ও থাকতে পারে।
তবে জুরি মেটার সব অভিযোগ গ্রহণ করেনি। ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর বিষয়বস্তু থেকে সুরক্ষিত রাখতে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন উদ্যোগ এবং তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে করা কিছু অভিযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত ছয় মাসের মধ্যে নিউ মেক্সিকোয় মেটার বিরুদ্ধে এটি দ্বিতীয় জুরি রায়। এর আগে মার্চে একই শহরের একটি জুরি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে তরুণ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে মেটা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে বলে রায় দিয়েছিল। ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়।
পরে ওই মামলার দ্বিতীয় পর্যায়ের শুনানি শেষে বিচারক মেটাকে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য তহবিলে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি নিউ মেক্সিকোয় কিশোর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর কয়েক সপ্তাহ পর শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আসক্ত করে তোলার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি অঙ্গরাজ্য, ওয়াশিংটন ডিসি ও কয়েকটি মার্কিন অঞ্চলের সঙ্গে বড় ধরনের সমঝোতায় যায় মেটা। ওই সমঝোতায় প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার দিতে সম্মত হয়।
ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্যের অভিযোগে মামলা করা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে ওই সমঝোতার আওতায় ৪৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার দেওয়ার বিষয়ও ছিল। তবে নিউ মেক্সিকো ওই সমঝোতার অংশ না হওয়ায় সেখানে মেটার বিরুদ্ধে মামলাটি আদালতে গড়ায়।
খুলনা গেজেট/উউরা

