অজান্তেই শরীরে ঢুকছে বিষাক্ত রাসায়নিক

গাজী আবুল হোসেন

সচেতনতার বিকল্প নেই। মানুষের জীবন তো একটাই। পরম যত্নে গড়ে ওঠা এই জীবন মানুষের অজান্তেই প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। পরিশেষে কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবার তথা দেশ ও জাতির বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

রাস্তার পাশের ভাজাপোড়ার দোকান, হোটেল কিংবা ফাস্টফুডের স্টল দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত এক দৃশ্য। গরম তেলে ভাজা মুখরোচক খাবার পরিবেশনের সময় ব্যবহার করা হচ্ছে পুরোনো পত্রিকার কাগজ। ছোলা, পেঁয়াজু, সমুচা, চিকেন ফ্রাই কিংবা ঝালমুড়ি সবই তুলে দেওয়া হচ্ছে সেই কাগজে। এমনকি কোনো কোনো হোটেলে সকালের নাস্তায় রুটি-পরোটাও দেওয়ার সময় পত্রিকার কাগজ ব্যবহার করা হয়। আর এসব খাবার খাচ্ছেন মানুষ প্রতিদিন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অভ্যাসকে স্বাভাবিক মনে করা হলেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।

নানা শ্রেণির পাঠকের হাত ঘুরে আসা পত্রিকার কাগজে থাকা ময়লা, রোগজীবাণু, কালি ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান গরম ও তেলযুক্ত খাবারের সঙ্গে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গরম খাবার যখন সংবাদপত্রের কাগজের সংস্পর্শে আসে, তখন কাগজে ব্যবহৃত কালি ও রাসায়নিক উপাদান খাবারের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন এসব রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে লিভার, কিডনি ও পরিপাকতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে পত্রিকার কাগজে খাবার পরিবেশন বন্ধ করতে হবে। এর পরিবর্তে ফুড-গ্রেড কাগজ, টিস্যু বা স্বাস্থ্যসম্মত প্যাকেজিং ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সংবাদপত্রের কালিতে মিনারেল অয়েল, রাসায়নিক সলভেন্ট এবং বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপাদান থাকতে পারে। গরম খাবারের সংস্পর্শে এলে এসব উপাদান খাবারে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাবার গ্রহণ করলে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

শহরের বিভিন্ন ভাজাপোড়ার দোকান ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বিক্রেতাই এখনো খাবার পরিবেশনে পুরোনো সংবাদপত্র ব্যবহার করছেন। বিক্রেতাদের দাবি, সহজলভ্য ও কম খরচ হওয়ায় তারা এ পদ্ধতি অনুসরণ করেন।

নওয়াপাড়ায় ফুটপাতে ভাজাপোড়া বিক্রেতা শরিফ হোসেন বলেন, “প্রায় ১৫ বছর ধরে এভাবেই খাবার দিয়ে আসছি। আগে কেউ এ বিষয়ে আপত্তি করেননি। কাগজ সহজে পাওয়া যায় বলেই ব্যবহার করি। তবে ক্ষতিকর হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।”

আরেক দোকানি হালিম বলেন, “ক্রেতারাও কাগজে মুড়িয়ে খাবার নিতে অভ্যস্ত। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সচেতনতা বাড়ালে আমরাও পরিবর্তন আনব।”

ক্রেতাদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। কলেজ শিক্ষার্থী ফারহানা ইসলাম তন্বী বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি পত্রিকার কাগজে খাবার দেওয়া হয়। এটি যে ক্ষতিকর হতে পারে, আগে জানতাম না। এখন থেকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকব।”

অভিভাবক আফসার আলী বলেন, “শিশুরা প্রায়ই বাইরের ভাজাপোড়া খাবার খায়। এসব খাবারের সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক শরীরে গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে এটি উদ্বেগের বিষয়।”

স্থানীয় প্রিন্টিং প্রেস মালিক জাকির হোসেন বলেন, “সংবাদপত্রের কালিতে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। এসব উপাদান খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।”

গ্রীন অভয়নগরের সদস্য সচিব ও সাবেক সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হুমায়ুন কবির তানিম বলেন, “জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। বিভিন্নভাবে প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে এই সমস্যা অচিরেই দূর হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”

অভয়নগর নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ এস এম খায়রুল বাসার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই রীতি শহরাঞ্চলের ফুটপাতের অধিকাংশ ফাস্টফুডের দোকানে প্রচলিত রয়েছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে তাদের ধারণা না থাকায় প্রতিনিয়তই খবরের কাগজে খাবার দেওয়া হচ্ছে এবং মানুষও তা সহজে গ্রহণ করছে।”

অভয়নগর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার আলিমুর রাজিব বলেন, “খবরের কাগজে খাবার গ্রহণে অনেক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে এর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা না দিলেও দীর্ঘদিন পত্রিকার কাগজে খাবার গ্রহণের ফলে পেটের অসুখসহ নানা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে।”

এ বিষয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শিরিন নিগার বলেন, “পত্রিকার কাগজ কখনোই খাবার পরিবেশনের উপযোগী নয়। এতে ব্যবহৃত কালিতে ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও লেডের মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। দীর্ঘদিন এসব উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি হরমোনজনিত জটিলতা ও ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।”

এ ব্যাপারে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এসএম আনোয়ার হোসেন বলেন, “অনেক সময় তাৎক্ষণিক কোনো সমস্যা দেখা না দেওয়ায় মানুষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এসব রাসায়নিক শরীরে জমে নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পত্রিকার কাগজে গরম খাবার পরিবেশন ও গ্রহণের অভ্যাস এখনই পরিবর্তন করতে হবে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষক, মহাকাল পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, চেঙ্গুটিয়া, যশোর।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন