অবৈধ ইটভাটা, পুকুর খনন ও ঘরবাড়ি ভরাটসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত কেটে ফেলা হচ্ছে কৃষি জমির উপরিভাগ বা ঞড়ঢ়ংড়রষ. ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট, গাছের পুষ্টি কমে যাওয়া, কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। টপ সয়েলে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও অণুজীব থাকে। ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি বা টপ সয়েল কাটা ও কমানো বন্ধে সরকারের সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। এই আইনগুলো অনুযায়ী জেলা প্রশাসন বা উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কৃষি জমির উপরিস্তর কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। তবু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারীর অভাবে ও রাতের অন্ধকারে কেটে ফেলা হচ্ছে মাটির উপরিভাগ।
মাটির উপরিভাগের ৮ থেকে ১০ ইঞ্চির মধ্যেই থাকে মাটির সব প্রধান পুষ্টিগুণ ও উর্বরতা সৃষ্টিকারী উপাদানসমূহ। জমির উপরিভাগের মাটিতে প্রধানত চারটি মূল উপাদান থাকে: ৪৫% খনিজ পদার্থ (বালি, পলি ও কাদা), ৫% জৈব পদার্থ (হিউমাস বা পচাগলা অংশ), ২৫% বায়ু এবং ২৫% পানি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জৈব পদার্থ, যা গাছের পুষ্টির প্রধান উৎস। টপসয়েল কেটে ফেলায় মাটিতে থাকা নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম হারিয়ে যায়। ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি কমে যাওয়ায় ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
মাটির মূল প্রাণ হলো জৈব পদার্থ, যা টপ সয়েল কাটার সাথে সাথে চলে যায়। মাটি তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়। সহজে মাটি ক্ষয় হয় এবং বৃষ্টির পানিতে জমি ভেঙে যায়। মাটিতে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও কীটপতঙ্গ মারা যায়।
এদিকে, প্রধান উপাদানসমূহখনিজ পদার্থ (৪৫%): শিলা ভেঙে তৈরি হয় বালি, পলি ও কর্দম কণা। জৈব পদার্থ (৫%) হিসেবে মাটিতে থাকে পচা পাতা, মৃত জীবজন্তু ও গাছপালার অবশিষ্টাংশ।
বায়ু ও পানি (২৫%) করে থাকায় মাটির কণাগুলোর মাঝের ফাঁকা জায়গায় থাকা বাতাস ও শিকড়ের মাধ্যমে গাছ ও অণুজীবের বেঁচে থাকার রসদ। ছোট প্রাণীগুলি ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও কেঁচো যা মাটি নরম রাখে।
সংশ্লিষ্ট প্রধান আইনসমূহ ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩: এই আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য বা কর্ষণীয় জমির উপরি-স্তর কাটা নিষিদ্ধ। অনুমতি ছাড়া কাটলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন (সংশোধনসহ) আইনের বিধান অনুযায়ী উর্বর কৃষি জমি বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি নষ্ট করা সম্পূর্ণ নিষেধ। তবে নিজ প্রয়োজনে বসতবাড়ি নির্মাণে সীমিত পরিসরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে কিছুটা মাটি কাটার অনুমতি পাওয়ারও বিধান রয়েছে। এদিকে, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ মোতাবেক ইটভাটার কাঁচামাল হিসেবে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি বা টপ সয়েল ব্যবহার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।
জাতীয় বা রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশজুড়ে এ পর্যন্ত ঠিক কত হেক্টর জমির টপ সয়েল (উপরিভাগের মাটি) কাটা হয়েছে, তার কোনো নির্দিষ্ট বা পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় হিসাব সরকারের কাছে নেই। তবে বিভিন্ন স্থানীয় গবেষণা, গণমাধ্যমের রিপোর্ট ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী এটি একটি ব্যাপক ও নীরব ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত।
বেশিরভাগ টপ সয়েল বা উর্বর মাটি রাতের আঁধারে বা গোপনে অবৈধ ইটভাটা, পুকুর খনন ও ঘরবাড়ি ভরাটের কাজে কাটা হয়। টপ সয়ের কাটা রোধে স্থানীয় প্রশাসন বা ভূমি অফিসগুলোর নিয়মিত তদারকি ও সুনির্দিষ্ট ডেটাবেজ না থাকায় এর সঠিক পরিসংখ্যান রাখা হয় না।
মৃৃত্তিকা উন্নয়ন ইনিস্টিটিউট খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বেগম সামিয়া বলেন, ফসল উৎপাদনের প্রকার ভেদে মাটির উপরিভাগের ৯ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত স্তরকে উদ্ভিদের খাদ্য ভান্ডার বলা হয়। প্রতিনিয়ত আমাদের কৃষি জমি কমছে। তার মধ্যে ইটভাটায় ব্যবহার আর বিভিন্ন স্থান ভরাট কাজে টপ সয়েল কাটা পড়ছে। আমরা বিভিন্ন ভাবে কৃষকদের সচেতন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, কারণ আমাদের হাতে আইন প্রয়োগের সুযোগ অনেক কম। তবে মাটির টপসয়েল কাটা বন্ধ না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে খাদ্য শষ্য উৎপাদনের ওপর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক জানান, আমাদের কৃষি জমির পরিভাগেই মাটির প্রয়োজনীয় উপাদান থাকে। কৃষির একটি টার্ম আছে যে, দীর্ঘদি ধরে জমি চাষের ফলে মাটির উপরের ৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত একটি শক্ত লেয়ার তৈরী হয়। এটিকে বলে লাঙ্গল স্তর। লাঙ্গল স্তরের নীচে পুষ্টিগুণ থাকে না। কৃষি জমির উপরের স্তর কেটে ফেলা হলে সেখানে আর ফসল হয় না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের যতটুকু সামর্থ আছে তা দিয়ে আমরা প্রশিক্ষণের সময় কৃষকদের অবহিত করি। কিন্তু ইটভাটা মালিকদের প্রলোভনে বেশি টাকা আয়ের লোভে কৃষকরা জমির টপসয়েল বিক্রি করে দেয়। টপসয়েল একবার কাটা পড়লে এটি পুরণ হতে স্থান ভেদে ১০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তবে টপসয়েল বিক্রি করার যে বিধিনিষেধ সেটা মানলে এটি বিক্রি করা যায় না। আইন আছে এটি প্রতিরোধের, কিন্ত আমাদের সেধরণের সক্ষমতা নেই যে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে সেটি প্রতিরোধ করার।’
খুলনা গেজেট/এনএম

