যশোর শহরতলির চাঁচড়া মাগুরপট্টিতে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি প্রশ্নবিদ্ধ ভবনে পরিণত হয়েছে। এটি কতটুকু কাজে লাগছে এই অঞ্চলের মৎস্য ব্যবসায়ীদের, এ প্রশ্ন এখন মৎস্যখাতের সংশ্লিষ্টদের। কী কারণে কেন্দ্র মুখি হচ্ছে না ব্যবসায়ী বা মৎস্য ক্রেতারা? সে বিষয়ে কেন্দ্রের ব্যবসায়ী, বাবলাতলা রাস্তার পাশের মাছের পোনা বিক্রেতা, হ্যাচারি মালিক সমিতি, উপজেলা ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে বেরিয়ে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
যশোর শহরতলির চাঁচড়া মাগুরপট্টিতে মাছের পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর আট কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮০ শতক জমি অধিগ্রহণ করে। আর আট কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। ৫১টি হাউস এবং দুইতলায় হাঁড়ি বসিয়ে পোনা বিক্রির জায়গা রেখে ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয় এই কেন্দ্রটি।
সূত্র জানায়, মাছের পোনা বিক্রির এ কেন্দ্রের ৫১টি হাউসের মধ্যে বর্তমানে সাতটি হাউস ব্যবহার হচ্ছে। যা কেন্দ্রের মোট সংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ। সাতজন ব্যবসায়ী হাউস বরাদ্দ নিয়ে পোনা বিক্রি করছেন বলে জানান কেন্দ্রে ব্যবসারত সামিউল্লাহ হোসেন। পানির লাইন সংকুচিত এবং আয়রনযুক্ত হওয়ায় তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এই সমস্যা সমাধানের দাবি তার। একটি হাউস একজন ব্যবসায়ী নীতিতে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে এই সংখ্যা আরও কম বলে দাবি স্থানীয়দের। তবে কেন্দ্রটির এ অবস্থা থাকলেও চাঁচড়া অঞ্চলের মূল উন্মুক্ত পোনার বাজার বা মৎস্য পল্লিটি দেশের মৎস্য খাতে বিশাল অবদান রাখছে।
এদিকে, কেন্দ্রের নিচতলায় ৫১ টি সিস্টার্ন আছে। এগুলো হ্যাচারির চারকোনা হাউসগুলোর মতো। একেকটি সিস টার্ন লম্বায় আট ফুট ও চওড়ায় তিন ফুট, উচ্চতা ৪ ফুট। আর ওপর তলায় হাড়ি পেতে ৬০ জনের মাছ বিক্রির জায়গা রয়েছে। প্রতি তলায় একটি করে পানির ট্যাংকি আছে। এখানে পানির রিসাইক্লিং সুবিধাও রয়েছে। আছে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহৃত পানি রিফাইন (পরিশোধন) করে পুনরায় ব্যবহারের বন্দোবস্তও। হাউস ভাড়ার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের একটি নীতিমালা আছে। সেই মোতাবেক বরাদ্দপ্রাপ্তদের বার্ষিক ভাড়া দিতে হবে। এক্ষেত্রে একেকটি সিস টার্নের (হাউস) ভাড়া বছরে ছয় হাজার টাকা। হাড়ি পেতে মাছ বিক্রির জন্য যারা বরাদ্দ পেয়েছেন তাদের বাৎসরিক ভাড়ার পরিমাণ ২৪০০ টাকা।
ভরা মৌসুমে এই হাটে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মণ পোনা মাছ কেনা-বেচা হয়, যার দৈনিক বাজার মূল্য প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলা এই বাজার থেকে ৫০-৬০টি ট্রাকে করে রুই, কাতলা, মৃগেল, পুঁটি, শিং, পাবদাসহ নানা জাতের পোনা ঢাকা, সিলেট, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এসব পোনা বিক্রির উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থায়নে তৈরি বিশেষায়িত ডিজিটাল বা আধুনিক বিপণন কেন্দ্র ভবনটি মৎস্য বিভাগের অব্যবস্থাপনা ও ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার কারণে ব্যবসায়ীদের মোটেই কাজে লাগছে না।
বেনাপোল-খুলনা মহাসড়কের পাশে চাঁচড়া বাবলাতলার ব্যবসায়ী ফুরকান হোসেন ও মুরাদ হোসেন জানান, ইলিশ মাছ বাদে সব রকম মাছের পোনা বিক্রি হচ্ছে বাবলাতলায়। বর্তমানে মাছের দাম বেশি, চাহিদাও বেশি। মাগুর মাছ হাউসে রেখে বিক্রি করা যায়। কিন্তু ওই হাউসে সব মাছ রাখা যায় না। আর পোনা বিক্রয় কেন্দ্রের হাউসগুলোর ধারণ ক্ষমতা কম। ৫-১০ হাজার মাছ ধরে হাউসে। পাঙাশ মাছ হাউসে রাখা যায় না। কাতলা, রুই, মৃগেল মাছের পোনা হাউসে রেখে বিক্রি করা যায় না। এই মাছের জায়গা লাগে বেশি। পুকুরে রেখে বিক্রি করা সুবিধা। মাগুরপট্টিতে এক সময় মাগুর মাছের রমরমা ব্যবসা ছিল। ওই সময় প্রভাবশালী মাগুর মাছ ব্যবসায়ীরা তাদের সুবিধা চিন্তা করে ওই স্থানে বিক্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছেন। হাউস ভাড়া প্রতিদিন ২০০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। যা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করেন। সরকার নিয়ন্ত্রণ করে না। তারা ইচ্ছামতো ভাড়া নেয়। বিক্রয় কেন্দ্রে নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। বাজারটা নষ্ট হয়ে গেছে কিছু দালালচক্রের কারণে।
সদর উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তা রিপন কুমার ঘোষ জানান, ৮ থেকে ১০ জন মৎস্য ব্যবসায়ীকে বর্তমানে কেন্দ্রটি বরাদ্দ দেওয়া আছে। আর বর্তমানে ৪০টি হাউস খালি রয়েছে। কেন্দ্রের বাইরে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে পুকুর লিজ নিয়ে ১০-১২ গুণ বেশি অর্থ খরচ করে রাস্তার পাশে পোনা বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। আমাদের কাছে একাধিক হয়রানির অভিযোগ আসে। পোনা কিনতে বিকাশে টাকা পাঠালে বিক্রেতারা পোনা সরবরাহ করে না। ১০ কেজি মাছ কিনলে বাড়িতে গিয়ে পান ছয় কেজি মাছ।
যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চাঁচড়া ডালমিল এলাকার চৌধুরী মৎস্য হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী শামসুদ্দিন চৌধুরী সুমন বলেন, ত্রুটিপূর্ণ স্থাপত্যশৈলীতে পোনা বিক্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে ওভার ট্যাংকির ধারণ ক্ষমতা পর্যাপ্ত নয়। হাউসের ক্যাপাসিটির সাথে পানির ট্যাংকি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ৫১টি হাউস সবগুলো একসাথে ব্যবহার শুরু হলে পানি সরবরাহ করতে পারবে না। পানি ইন-আউটে সমস্যা রয়েছে। যে পাইপগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলো খুবই চিকন এবং ত্রুটিপূর্ণ।
এসব ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিক্রয় কেন্দ্রটি করা হয়েছিল। তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের আগে পোনা বিক্রয় কেন্দ্রে প্রকৃত মৎস্য ব্যবসায়ীদেও হাতে ছিলো না, এমন লোকদের হাতে বরাদ্দ চলে গিয়েছিল। এমন ৩০ টি বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। তারা বছরের ইজারা নবায়ন না করে অসাধু উপায়ে দখল রেখে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। তাদের জামানতের অর্থ থেকে বকেয়া ইজারার খরচ সমন্বয় করা হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

